জ্বালানি সার্বভৌমত্ব: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় প্রশ্ন

মুহাম্মদ আজগর হোসেন জিহাদ:

মতামত

একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু তার ভূখণ্ড, সীমান্ত, সংবিধান কিংবা রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রের প্রকৃত

2026-08-23T19:29:45+06:00
2026-08-23T19:33:42+06:00
রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

জ্বালানি সার্বভৌমত্ব: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় প্রশ্ন
মুহাম্মদ আজগর হোসেন জিহাদ:
প্রকাশ: রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ৭:২৯ পিএম  আপডেট: ২৩.০৮.২০২৬ ৭:৩৩ পিএম  (ভিজিট : ১)

একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু তার ভূখণ্ড, সীমান্ত, সংবিধান কিংবা রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর। যে রাষ্ট্র নিজের শিল্প, কৃষি, পরিবহন, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারে না, সে রাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে বহির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সার্বভৌমত্ব এখন আর কেবল জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি নীতিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো; দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ঐতিহাসিক নির্ভরতা থাকলেও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে LNG, কয়লা ও তরল জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবস্থায় দেশীয় গ্যাস এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে; পাশাপাশি LNG আমদানি ঘাটতি পূরণের একটি প্রধান উপায় হয়ে উঠেছে।

অতএব বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি শুধু “কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করব?” নয়। আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো; “আমাদের অর্থনীতি সচল রাখতে জ্বালানির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? বাংলাদেশের হাতে, নাকি আন্তর্জাতিক বাজার ও জিও স্টেক হোল্ডদডারদের  হাতে?” আর এই প্রশ্নের উত্তরই বাংলাদেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

জ্বালানি সার্বভৌমত্ব হলো এমন একটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, যার মাধ্যমে একটি দেশ তার জনগণ ও অর্থনীতির প্রয়োজনীয় জ্বালানি পর্যাপ্ত পরিমাণে, যুক্তিসংগত মূল্যে, নিরবচ্ছিন্নভাবে,বৈচিত্র্যময় উৎস থেকে, পরিবেশগতভাবে টেকসই পদ্ধতিতে এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে পারে। এটি জ্বালানি স্বনির্ভরতা থেকে কিছুটা ভিন্ন। স্বনির্ভরতার অর্থ হতে পারে; রাস্ট্র নিজের জ্বালানি নিজেই উৎপাদন করবে। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে সম্পূর্ণ জ্বালানি স্বনির্ভরতা অধিকাংশ দেশের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। অন্যদিকে জ্বালানি সার্বভৌমত্বের অর্থ হলো; আমদানি করলেও সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ রাস্ট্রের হাতে রাখা। অর্থাৎ বাংলাদেশ LNG আমদানি করতে পারে, তেল আমদানি করতে পারে, এমনকি বিদ্যুৎও আমদানি করতে পারে। কিন্তু কোনো একটি দেশ, কোম্পানি, জ্বালানি উৎস, সমুদ্রপথ বা আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়লে রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বাধীনতা সংকুচিত হয়।

বাংলাদেশের জ্বালানি বাস্তবতায় নির্ভরতা থেকে ঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জ্বালানি অর্থনীতি মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। কিন্তু পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে এবং আমাদের প্রতিদিন চাহিদা বাড়ছে। ফলে LNG আমদানি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ LNG আমদানি শুরু করে এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ও স্পট মার্কেট উভয় ধরনের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আমাদের নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের বাস্তবতা এই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির ওপর চাপের কারণে বাংলাদেশের LNG সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে এবং স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে; জ্বালানি আমদানি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি ভূরাজনৈতিক বিষয়। একটি LNG কার্গো শুধু একটি পণ্য নয়। এর সঙ্গে যুক্ত;উৎপাদনকারী দেশ, সরবরাহকারী কোম্পানি,সমুদ্রপথ,বীমা,আন্তর্জাতিক মূল্য,ডলার,ভূরাজনৈতিক সংঘাত,বন্দর ও টার্মিনাল,এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি। অতএব কোনো একটি আন্তর্জাতিক সংকট বাংলাদেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

LNG: প্রয়োজনীয় বিক্লপ, কিন্তু স্থায়ী সমাধান নয়

বর্তমান পরিস্থিতিতে LNG বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে LNG ছাড়া স্বল্পমেয়াদে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতকে সচল রাখা কঠিন।
বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ নিরাপত্তা বাড়াতে LNG আমদানির জন্য অর্থায়ন ও গ্যারান্টি কাঠামোর সহায়তা করছে। ২০২৬ সালের অতিরিক্ত অর্থায়ন কর্মসূচির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে LNG আমদানির অর্থায়ন সহজ করা এবং ব্যয়বহুল স্পট মার্কেটের পরিবর্তে অধিক পূর্বানুমানযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু এখানে রাষ্ট্রীয় নীতির একটি মৌলিক সতর্কতা প্রয়োজন।

LNG-কে ঘাটতি ব্যবস্থাপনার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে; কিন্তু LNG-নির্ভর অর্থনীতি তৈরি করা জ্বালানি সার্বভৌমত্বের বিকল্প নয়।
কারণ LNG আন্তর্জাতিক মূল্যের ওপর নির্ভরশীল; ডলার ব্যয়ের প্রয়োজন হয়; সরবরাহ শৃঙ্খলা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে থাকে; দীর্ঘমেয়াদে মূল্য অস্থিরতা তৈরি করতে পারে; আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সুতরাং LNG হবে সেতু, গন্তব্য নয়।

দেশীয় গ্যাস: বাংলাদেশের প্রথম সার্বভৌম সম্পদ

বাংলাদেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্বের প্রথম স্তম্ভ হওয়া উচিত দেশীয় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্থল ও সমুদ্রভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম চলছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ২৬টি অফশোর ব্লক নিয়ে নতুন Offshore Bidding Round চালু করেছে। এটি কেবল বিনিয়োগ আহ্বানের বিষয় নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন যুক্ত।

বাংলাদেশের উচিত “আমাদের ভূগর্ভে কী আছে”এই প্রশ্নের উত্তর আগে নিজেরাই খুঁজে বের করতে হবে।এক্ষেত্রে  দেশীয় অনুসন্ধানের তিনটি নীতি গুরুত্বপূর্ণ; প্রথমত; Exploration First। আমদানি বাড়ানোর আগে দেশের সম্ভাব্য গ্যাস ও তেল সম্পদের পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জরিপ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত; National Capacity
BAPEX সহ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত ; Strategic Partnership
বিদেশি কোম্পানিকে প্রয়োজন হলে অংশীদার করা যেতে পারে, কিন্তু সম্পদের মালিকানা, তথ্য, নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের সমুদ্র অথ'নিতী বা ব্লু ইকোনোমিতে সম্ভাব্য জ্বালানি সীমান্ত নিধ'রণ করে আমাদের ন্যশনাল ফোকাসকে প্রধান্য দিয়ে হবে। বাংলাদেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে অব্যবহৃত ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো বঙ্গোপসাগর।

অফশোর ব্লকগুলোতে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না হলে বাংলাদেশ নিজের সম্ভাব্য সম্পদ সম্পর্কে অন্ধকারে থাকবে। অতএব সমুদ্রভিত্তিক জ্বালানি অনুসন্ধানকে শুধু একটি বিনিয়োগ প্রকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত; জাতীয় কৌশলগত অনুসন্ধান কর্মসূচি।এর মধ্যে থাকতে পারে; 2D ও 3D seismic survey, গভীর সমুদ্রের ভূতাত্ত্বিক গবেষণা, অফশোর ড্রিলিং,ডাটা লাইব্রেরি তৈরি, জাতীয় জিওসাইন্স ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি করতে হবে, আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে স্বচ্ছ PSC,এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক revenue sharing কাঠামো ঐক্য মতের ভিত্তিতে ঘোষনা করতে হবে। আমাদের জানা থাকা উচিত যে; দেশের ভূগর্ভ ও সমুদ্রভাগের সম্পদ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে কোনো রাষ্ট্রই পূর্ণ জ্বালানি পরিকল্পনা করতে পারে না।কয়লা আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থভিত্তিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে কয়লা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। পরিবেশগত ঝুঁকি, কৃষিজমি, পানি, জনবসতি ও প্রযুক্তিগত প্রশ্নের কারণে কয়লা উত্তোলন একটি সংবেদনশীল বিষয়।

তবু বাংলাদেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্বের আলোচনায় কয়লাকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচটি কয়লাক্ষেত্র শনাক্ত হয়েছে এবং  বড়পুকুরিয়া0 বর্তমানে দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল কয়লাখনি। এক্ষেত্রে প্রয়োজন “Coal for sovereignty” নয়, বরং “Evidence-based coal policy”।

অর্থাৎ—
কোথায় কয়লা উত্তোলন অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক?
কোথায় পরিবেশগত ক্ষতি গ্রহণযোগ্য নয়?
কোন প্রযুক্তিতে পানি ও ভূমির ক্ষতি কম?
স্থানীয় জনগণ কী সুবিধা পাবে?
আমদানি করা কয়লার তুলনায় দেশীয় কয়লার প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য কত?
এসব প্রশ্নের উত্তর বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

৭. নবায়নযোগ্য জ্বালানি: সার্বভৌমত্বের নতুন ভিত্তি

দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সম্পদ হয়তো মাটির নিচে নয়—সূর্যের আলোতে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ২০২৬ সালের আগস্টে BPDB-এর তথ্য অনুযায়ী গ্যাসভিত্তিক স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় ৪২ শতাংশ, কয়লা প্রায় ২৮ শতাংশ এবং solar প্রায় ২.৭ শতাংশ; অর্থাৎ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট। এখানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নীতির বড় সুযোগ।

বাংলাদেশকে সৌরশক্তিকে শুধু “গ্রিন এনার্জি” হিসেবে নয়, “সার্বভৌম জ্বালানি” হিসেবে দেখতে হবে।কারণ সূর্যের আলো আমদানি করতে হয় না,
ডলারে কিনতে হয় না, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের অনুমতির প্রয়োজন নেই,সমুদ্রপথের ওপর নির্ভর করে না। অবশ্য সোলার এর intermittency, land constraint, storage এবং grid integration এর সমস্যা রয়েছে। তাই শুধু solar panel বসালেই জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জিত হবে না। আমাদের প্রয়োজন হবে; Solar + Storage + Smart Grid + Transmission + Demand Management এই সমন্বিত মডেল।

জ্বালানি সার্বভৌমত্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্ন হলো ডলার। তেল, LNG, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানি করতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে বেশি ডলার লাগে।
ফলে জ্বালানি আমদানি শুধু energy deficit তৈরি করে না; এটি balance of payments pressure তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ; জ্বালানি ঘাটতি → আমদানি বৃদ্ধি → ডলার চাহিদা বৃদ্ধি → বৈদেশিক মুদ্রার চাপ → শিল্প ব্যয় বৃদ্ধি → মূল্যস্ফীতি → জনগণের ওপর চাপ।
এ কারণে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব আসলে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বেরও একটি অংশ।

বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, জ্বালানি ব্যবস্থার পুনর্গঠন

বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাকে অনেক সময় জ্বালানি নিরাপত্তার সমার্থক মনে করা হয়।
কিন্তু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরি হয় না। প্রশ্ন হলো; কেন্দ্রটি চালানোর জ্বালানি কোথা থেকে আসবে?
২০২৬ সালের BPDB তথ্য দেখায় যে বাংলাদেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার বড় অংশ এখনো গ্যাস, কয়লা ও liquid fuel নির্ভর। অতএব ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় শুধু generation capacity নয়, পুরো fuel chain বিবেচনা করতে হবে; Exploration → Production → Import → Storage → Transmission → Generation → Distribution → Efficient Consumption
এই পুরো শৃঙ্খলকে জাতীয় জ্বালানি কৌশলের অংশ করতে হবে।

অঅভ্যন্তরীণ জ্বালানি মজুত বাংলাদেশের  অবহেলিত দুর্বলতা'র জায়গা।জ্বালানি সার্বভৌমত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্টেজেটিক রিজাভ'।
যদি আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ সংকট দেখা দেয়, তাহলে কয়েক দিনের আমদানি বন্ধ হয়ে গেলেই যেন বাংলাদেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অচল না হয়ে পড়ে। তাই  প্রয়োজন পযাপ্ত এল এন জি স্টোরেজ ক্যাপাসিটি, প্যাট্রল রিজাভ' কয়লা রিজাভ',ইমাজেন্সি ফুয়েল স্টক,strategically located storage facilities, এবং জাতীয় emergency fuel management system।

জ্বালানি নিরাপত্তার অর্থ শুধু “জ্বালানি পাওয়া” নয়, সংকটের সময়েও জ্বালানি পাওয়া। আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতায় শুধু নির্ভরতা নয়, কৌশল গ্রহন করতে হবে। বাংলাদেশ আঞ্চলিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা থেকে উপকৃত হতে পারে।ভারত, নেপাল, ভুটানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক grid connectivity বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু এখানে আমাদের একটি মৌলিক নীতি থাকা দরকার, Regional cooperation must strengthen sovereignty, not replace it.
অর্থাৎ একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া যাবে না।

একাধিক উৎস, একাধিক সরবরাহকারী এবং নিজস্ব উৎপাদন,এই diversification ই হবে নিরাপদ পথ।
জ্বালানি নীতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন
বাংলাদেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্ব শুধু নতুন প্রকল্পের ওপর নির্ভর করবে না; জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে।
বিশেষভাবে প্রয়োজন; BAPEX এর exploration capacity বৃদ্ধি; Petrobangla র প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে; বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের strategic storage বৃদ্ধি;
Geological Survey-এর গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি;
জাতীয় energy data centre প্রতিষ্ঠা; জ্বালানি গবেষণা ও innovation ecosystem তৈরি;
 দেশীয় প্রকৌশলী ও geoscientist তৈরির ব্যবস্থা।

একটি রাষ্ট্র যদি নিজের জ্বালানি সম্পদের তথ্য, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল নিজের হাতে রাখতে না পারে, তবে তার জ্বালানি সার্বভৌমত্বও সীমিত থাকবে।
আমারে নাগরিক প্রশ্ন“জ্বালানি গণতন্ত্র” এ জনগণের অধিকার কোথায়? জ্বালানি সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা নয়।
এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো জনগণের সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি অধিকার নিশ্চিত করা। একটি জ্বালানি ব্যবস্থা তখনই সার্বভৌম যখন; কৃষক সেচের জ্বালানি পায়,শিল্প নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ পায়,পরিবহন ব্যবস্থা সচল থাকে,নিম্নআয়ের মানুষ সাশ্রয়ী জ্বালানি পায়,গ্রামীণ মানুষ বিদ্যুৎ পায়, এবং রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা সামাল দিতে পারে। অতএব জ্বালানি সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞায় জনস্বার্থকে কেন্দ্রে রাখতে হবে।

বাংলাদেশ চাইলে আগামী ২০ বছরের জন্য একটি সমন্বিত National Energy Sovereignty Strategy গ্রহণ করতে পারে।
এর প্রধান স্তম্ভ হতে পারে;
 Domestic Exploration First
স্থল ও সমুদ্রে ব্যাপক তেল-গ্যাস অনুসন্ধান।
 LNG as Transition Fuel
LNG থাকবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি আমদানি-নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য থাকবে।
Renewable Sovereignty
Solar, wind, biomass এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের দ্রুত সম্প্রসারণ।
Strategic Fuel Reserve
তেল, LNG ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির কৌশলগত মজুত।
Diversified Supply
কোনো একটি দেশ, কোম্পানি বা সরবরাহপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নয়।
National Energy Companies
BAPEX, Petrobangla, BPC ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি।
Energy Efficiency
“More energy production” নয়—“less energy waste”-কেও জাতীয় নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে।
Smart Grid
ডিজিটাল grid, storage এবং demand management-এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন।
Energy Diplomacy
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে জ্বালানি কূটনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার দেওয়া।
Public Interest
সবশেষে জ্বালানি নীতির লক্ষ্য হবে জনগণের সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি অধিকার।

জ্বালানি স্বাধীনতা ছাড়া পূর্ণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ।বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে বহু আগে। কিন্তু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীনতার বাস্তব অর্থ তখনই পূর্ণ হয়, যখন সে তার অর্থনীতির মৌলিক চালিকাশক্তিগুলোর ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।জ্বালানি সেই চালিকাশক্তিগুলোর অন্যতম।আজ বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ।একদিকে রয়েছে ক্রমবর্ধমান LNG, তেল ও কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরশীল একটি অর্থনীতি, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজার, ভূরাজনীতি, সমুদ্রপথ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে। অন্যদিকে রয়েছে একটি বৈচিত্র্যময়, দেশীয় সম্পদভিত্তিক, নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর এবং কৌশলগতভাবে স্বাধীন জ্বালানি ব্যবস্থা।

দ্বিতীয় পথটি কঠিন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটিই অধিক নিরাপদ।বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সার্বভৌমত্বের মূল দর্শন হতে পারে;“যে জ্বালানি আমরা নিজেরা উৎপাদন করতে পারি, তা আমদানি করব না; যে জ্বালানি আমদানি করতেই হবে, তার উৎস বৈচিত্র্যময় রাখব; আর যে জ্বালানি ভবিষ্যতে দেশীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব, তার প্রযুক্তি ও অবকাঠামো আজ থেকেই তৈরি করব।”

জ্বালানি সার্বভৌমত্ব মানে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো;বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য করব, কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য বিশ্বের কারও ওপর নির্ভরশীল হব না।এটাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পরবর্তী স্তর।এবং একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব কেবল একটি অর্থনৈতিক নীতি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অন্যতম ভিত্তি।


লেখক : রাস্ট্রচিন্তক ও রাজনৈতিক।

ডেল্টা টাইমস/মুহাম্মদ আজগর হোসেন জিহাদ/সিআর/এমই









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ