বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট ছাড়াও নানা ধরনের সমস্যা, চালেঞ্জ ও সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদেরকে এসব বাধা পেরিয়ে সম্পর্ক উন্নয়নে এগিয়ে যেতে হবে। মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও থাইল্যান্ড তাঁদের এসব সংকট সমাধানে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে যা থেকে বাংলাদেশ এ বিষয়ে ধারনা পেতে পারে। রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মির হাতে থাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী সেখানে সব ধরনের পণ্য ও খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়াতে সেখানে খাদ্য ও জ্বালানির চরম সংকট তৈরি হয়েছে। মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে রাখাইনে সরবরাহ বন্ধ হলে বিকল্প পথ হলো ভারত ও বাংলাদেশ থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করা। রাখাইন ও চিন রাজ্যের জন্য ভারত – মিয়ানমার সীমান্তবর্তী মণিপুর ও মিজোরাম রাজ্য থেকে কিছু সরবরাহ আসে তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কারণ ভারতের এই রাজ্যগুলো ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করে। তাদের এই সমস্যা সমাধানে ভারত কালাদান মাল্টি মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে যা এখনও নির্মাণাধীন। আরেকটা পথ হল, বাংলাদেশ থেকে পণ্য প্রবাহ ও সীমান্ত বাণিজ্য, যা রাখাইনের অস্থিতিশীলতার কারনে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং সামরিক বাহিনী সরবরাহের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের কারণে রাখাইনে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চরম সংকট তৈরি হওয়াতে সেখানে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। নিত্যপণ্যের চরম সংকটের কারণে সেসবের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সীমান্ত বাণিজ্য ও আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য যোগাযোগ না থাকায় চোরাচালানের মাধ্যমে এই চাহিদা পুরন করা হচ্ছে। দ্রুত এই সমস্যা মোকাবেলায় মিয়ানমারের চোরাচালানকারীরা বাংলাদেশি পণ্যের ওপর নির্ভর করছে। বিশাল অংকের লাভের কারনে আইনি নজরদারিকে এড়িয়ে আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান কার্যক্রম চলছে। চোরাচালানকারীরা বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, নির্মাণসামগ্রী, জ্বালানি ও খাবার রাখাইনে পাঠাচ্ছে এর বিপরীতে এসব নিত্যপণ্যের আংশিক মূল্য মেটাতে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস) জাতীয় মাদককে ‘নার্কো-কারেন্সি’ বা মাদক-মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ও যুব সমাজ মাদকের করাল গ্রাসে পড়ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকসেবী। এই মাদকের চাহিদার প্রায় পুরোটাই সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে দেশে আসে।
আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর গত দুই বছরে দেশে ইয়াবার সরবরাহ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই কারবারে কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা ও স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র জড়িত। ‘অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ২০২৫ সালে ৪ কোটি ৩৫ লাখেরও বেশি ইয়াবা ও আইস ট্যাবলেট জব্দ করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৯০ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি, যা আশংকাজনক। আরাকান আর্মি বাংলাদেশে মাদক পাঠিয়ে এদেশ থেকে তাদের নিত্যপণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করছে। বাংলাদেশ আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ করতে না পারলেও চোরাকারবারীরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিকে ক্ষতি করছে ও আমাদের দেশে একটা মাদকাসক্ত সমাজ তৈরি করছে। সীমান্ত বাণিজ্য এ স্বাভাবিক বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরায় চালু করে আমাদেরকে এই দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা থেকে বের হতে হবে।
সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের মধ্যেকার আলোচনায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু এবং রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয় উঠে আসে। এর পাশাপাশি সরাসরি নৌযোগাযোগ, এলএনজি আমদানি এবং পারস্পরিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশ সরকার ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির আওতায় দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী এবং মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালুর পক্ষে মত দেয়। সীমান্ত বাণিজ্য চালু হলে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। দুদেশের মধ্যে কৃষিপণ্য, মৎস্যজাত পণ্য, চাল, ওষুধ ও হিমায়িত খাদ্যসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্য বাড়ানো, ব্যবসায়ী পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ জোরদার করে নৌ যোগাযোগ চালু হলে পরিবহন ব্যয় ও সময় কমবে, যা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভৌগোলিক নৈকট্য ও বিদ্যমান সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বাণিজ্য আরও বাড়ানো সম্ভব। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও অর্থবহ ও গতিশীল করতে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
মিয়ানমারের প্রতিবেশী থাইল্যান্ড তাদের নিজস্ব সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে আসিয়ানের মতামতের পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। মিয়ানমারের সাথে থাইল্যান্ডের প্রায় দুই হাজার ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট তাঁর দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করতে নির্বাচনের পর থেকেই বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং এর ধারাবাহিকতায় আগস্ট মাসের থাইল্যান্ড ভ্রমণ দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আসিয়ানের সদস্য দেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও সিঙ্গাপুর মনে করে যে, মিয়ানমারের মানবিক সংকট নিরসন এবং গৃহযুদ্ধের অবসানের জন্য সরকারের আরও ছাড় দেওয়া দরকার। তার আগে মিয়ানমারের সাথে পূর্ণমাত্রায় কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা উচিত হবে না। থাইল্যান্ড আসিয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেও নিজ দেশের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসেছে। অধিকারভিত্তিক সংগঠন জাস্টিস ফর মিয়ানমার জানায় যে, থাই সরকারের ‘পরিমিত পুনঃসম্পৃক্ততা’ নীতি মিয়ানমারের জনগণের চলমান দুর্ভোগকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমন, মানবপাচার ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো বিষয় মোকাবিলার জন্য থাইল্যান্ড দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরকারি যোগাযোগ প্রয়োজন বলে মনে করে।
ভারত, মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি বাণিজ্য ও অন্যান্য বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। প্রায় ছ’বছর বন্ধ থাকার পরে অরুণাচলপ্রদেশের চাংলাং জেলার পাংসাউ পাসে অবস্থিত ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত হাট পুনরায় চালু হয়েছে। এর ফলে ভারত – মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং পারস্পরিক যোগাযোগ নতুন গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অরুণাচলপ্রদেশের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী নামপংয়ে একটি ‘ল্যান্ড পোর্ট’ নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানায়, যা ভবিষ্যতে সীমান্ত বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করবে। মিয়ানমার ও ভারত একে অন্যের ভূখণ্ড বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যবহার করতে না দেয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। মিয়ানমারের ভারতের বিনিয়োগ এবং প্রকল্প গুলোর কাজ এগিয়ে নিতে দুই দেশ মিয়ানমারের শান্তি ও স্থিতিশীলতার উপর জোর দিয়েছে।
প্রায় ৯ বছর ধরে বাংলাদেশ প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার ভার বহন করে চলছে। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। তাই নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকার। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং অবকাঠামো উন্নয়নকে ও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করে মাদক পাচার, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে সক্রিয় তৎপরতা চালিয়ে যেতে হবে।
প্রতিবেশী দেশের সাথে অন্যান্য সমস্যা সমাধানের সাথেই বাংলাদেশকে এই সংকট মোকাবেলায় কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এবং জাতিসংঘের প্রচেষ্টার পরও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কোনো উদ্যোগই এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছা, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে পাঁচটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। নতুন করে অনুপ্রবেশ ঠেকানো, মিয়ারমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ জোরদার করা, জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্মকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার, মালয়েশিয়া-চীন-যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর সমন্বিত ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখাকে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে জোরালো দাবি তুলে ধরবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, মালয়েশিয়া, ভারতকে নিয়ে একটি জোট গঠন করে মিয়ানমারের ওপর বৈশ্বিকভাবে চাপ সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মানবিক সংকটের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সমস্যাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা, মানব পাচার, আন্ত সীমান্ত অপরাধের সাথে একত্রে এর বহুমাত্রিক প্রভাবের বিষয়টি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুস্পষ্ট ভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
আসিয়ানের দেশগুলো এবং চীনের সাথে সংযোগের জন্য স্থিতিশীল মিয়ানমার বিশেষ করে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নয়ন আবশ্যক। বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা ও রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মির হাতে থাকার কারনে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রস্তাবিত আন্তঃসীমান্ত গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরাকান আর্মির সম্মতির প্রয়োজন। এছাড়াও সীমান্ত বাণিজ্য, মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান ও সীমান্ত নিরাপত্তায় আরাকান আর্মিকে সাথে রাখতে হবে। রাখাইনের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হলে আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ শুরু করতে হবে। একই সাথে মিয়ানমার সরকারের সাথেও আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমার ও আরাকান আর্মির মনোভাব পরিবর্তনে কাজ করতে হলে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের বিকল্প নেই। বাংলাদেশকে গুরুত্বের সাথে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্থির করে তা বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে হবে।
লেখক: মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।
ডেল্টা টাইমস/ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন/সিআর/এমই