বিশ্বরাজনীতির নতুন মেরুকরণ ও বৈশ্বিক বাস্তবতা

রায়হান আহমেদ তপাদার:

মতামত

ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, সাম্রাজ্য উঠেছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে, নতুন শক্তির জন্ম হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী

2026-08-17T10:11:56+06:00
2026-08-17T10:11:56+06:00
সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

বিশ্বরাজনীতির নতুন মেরুকরণ ও বৈশ্বিক বাস্তবতা
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১১ এএম   (ভিজিট : ৪)

ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, সাম্রাজ্য উঠেছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে, নতুন শক্তির জন্ম হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল, একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বলয়, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক বলয়। প্রায় চার দশক ধরে এই দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করেছে। যুদ্ধের পরিবর্তে চলেছিল স্নায়ুযুদ্ধ, প্রক্সিযুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, মহাকাশ প্রতিযোগিতা এবং মতাদর্শিক লড়াই। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর অনেকেই মনে করেছিলেন ইতিহাসের সেই দ্বন্দ্ব শেষ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে উদার গণতন্ত্র, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং পশ্চিমা মূল্যবোধই হবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান ভিত্তি। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, কোনো শক্তিই চিরস্থায়ী নয়।বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও আর্থিক শক্তি। ডলারের আধিপত্য, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব, ন্যাটো জোটের সামরিক সক্ষমতা এবং উন্নত প্রযুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে। কিন্তু সেই নেতৃত্ব এখন আর প্রশ্নাতীত নয়। চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার আঞ্চলিক প্রভাব, ব্রিকসের সম্প্রসারণ, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। দীর্ঘদিন এই নীতি বাংলাদেশের জন্য কার্যকর ছিল, কারণ বিশ্ব রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকলেও ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য কিছুটা কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা সম্ভব ছিল। 

কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা সেই স্বাধীনতার পরিসরকে সংকুচিত করছে। এখন বড় শক্তিগুলো শুধু বন্ধুত্ব চায় না; তারা কৌশলগত অবস্থানও চায়। তারা শুধু অর্থনৈতিক অংশীদার খোঁজে না; বরং তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কারা পাশে থাকবে, সেটিও নিশ্চিত করতে চায়। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে নিরপেক্ষ থাকা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি আবার তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও। ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ, কিন্তু একই সঙ্গে এটি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। বঙ্গোপসাগর আজ শুধু একটি সমুদ্র নয়; এটি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন, নৌ-নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডর। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এই অঞ্চলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে যে রাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, সে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারবে। এই কারণেই বাংলাদেশকে ঘিরে বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ ক্রমাগত বাড়ছে।চীনের পক্ষ থেকে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডর সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নৈকট্য, একাধিক স্থলবন্দরের সুবিধা এবং বঙ্গোপসাগরের সুবিধা কাজে লাগিয়ে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরআই) প্রকল্পের অধীনে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি গত এক যুগের বেশি সময়ে।এর মূল কারণ ভারতের আপত্তি। আর এই আপত্তির মূল কারণ সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিকে (আইপিএস) পাশ কাটিয়ে চীনের বলয়ে ঢুকে না পড়ার বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের সচেতন সিদ্ধান্ত। আইপিএসের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্যকে রুখে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইন্দো-প্যাসিফিক দেশগুলোর সঙ্গে এমন একটি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা, যার মধ্য দিয়ে সদস্য দেশগুলোর কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করা যায়। 

ভারত যেহেতু বরাবরই ঐতিহাসিক এবং ভূকৌশলগতভাবে চীনের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক ধরে রেখেছে, বিসিআইএম নিয়ে তাদের সেই অর্থে তৎপরতা তাই দৃশ্যমান নয়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বরাজনীতির নতুন মেরুকরণে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েন, ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজাশেনের (এসসিও) মতো ফোরামে ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণ কিছু বার্তা দিচ্ছে। এই সঙ্গে এটাও বলে রাখা ভালো যে এর সবটাই হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্তের কারণে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শুল্কনীতি। আগামী মার্কিন প্রশাসনগুলো এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখবে কি না, এর ওপর কার্যত নির্ভর করছে অনেক কিছু। বাংলাদেশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুই বছর পর চীন সফর করলেন একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরটি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সফরের চেয়ে অনেকাংশেই ভিন্ন আমেজের। এই সফরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি অর্থবোধক পর্যায়ে নিয়ে যেতে বাংলাদেশের জন্য সাহায্যনির্ভরতাকে অতিক্রম করে পারস্পরিক স্বার্থের আলোকে কিভাবে আরো উচ্চতর পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে। এর অন্যতম বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক করিডর প্রতিষ্ঠা। আক্ষরিক অর্থে এটি একটি চমৎকার পরিকল্পনা, যার অর্থ দাঁড়ায় বাংলাদেশ ও চীন এই উভয় দেশের পণ্য এবং সেবা এক দেশ থেকে অন্য দেশে সহজেই পরিবাহিত হবে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে, যার ফলে সময় এবং পরিবহন ব্যয় উভয়ই কমবে, সেই সঙ্গে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগের পরিবেশ আরো অনুকূল হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হবে, সেই সঙ্গে এই পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তথা আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের পরিবেশ আরো উন্মুক্ত হবে।বিশ্বরাজনীতির বড় কথাই হলো সব সহজ বিষয় সব সময় সহজে সাধন করা যায় না।

এই যে এখানে ভারতের বিষয়টি উল্লেখ করা হলো, যদিও ভারতের এই প্রকল্পে আপাতত যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের দীর্ঘ মেয়াদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ চিন্তা করে যদি যুক্ত হয়, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ভৌগোলিক সুবিধার বাইরে যে আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কী সেই সীমাবদ্ধতা? এমন প্রশ্নের উত্তরে একবাক্যে এটুকুই সম্ভবত বলা সংগত হবে যে দিনশেষে কিঞ্চিৎ দূরবর্তী চীনের চেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের মেজাজ-মর্জি বুঝে চলা আমাদের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশের মধ্যকার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডর ভারতের স্বার্থের জন্য কোনো প্রকার ক্ষতিকারক না হলেও চারদিকে ভারতবেষ্টিত বাংলাদেশকে ব্যবহার করে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের সন্ধান ভারতের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। অতীতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েও একই বিষয় দেখা গেছে। চীনের দেওয়া প্রস্তাব আগের সরকার গ্রহণ না করে এ ক্ষেত্রে ভারতকে সবুজ সংকেত দিয়েছিল ভারতের মন রক্ষার্থে। এবার অবশ্য পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হওয়ার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।এই করিডর সরল ভাষায় এর সঙ্গে সম্পৃক্ত পক্ষগুলোর জন্য লাভজনক মনে হলেও বাস্তবে রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে মিয়ানমারের অস্থিতিশীল পরিবেশ। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। বরং বলা যায়, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে পরিস্থিতি বর্তমানে অনেকটাই খারাপ। এটি বোঝা যায় ২০২৩ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতভাবে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে এবং দেশটিতে গণতন্ত্র ফেরাতে, শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনয়নে এ ধরনের প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও চীন ও রাশিয়ার বাধার কারণে সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি। এই প্রস্তাবটিতে নিরাপত্তা পরিষদের এই দুই স্থায়ী দেশ ও ভারত ভোটদানে বিরত থাকে এবং বাকি ১২টি দেশ এর পক্ষে ভোট দেয়।

ফলে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উন্নয়নে এবং সেই সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদের তরফ থেকে কার্যত এক ধরনের ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সমস্যা হলো, তিন বছর সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। সবশেষে বলা যায়, বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন মেরুকরণ কোনো সাময়িক ঘটনা নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নতুন বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে আবেগ দিয়ে নয়, বরং প্রজ্ঞা, ভারসাম্য ও দূরদর্শিতা দিয়ে পথ চলতে হবে। কারণ পরাশক্তিরা তাদের স্বার্থেই বন্ধুত্ব করে, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের স্থায়ী দায়িত্ব হলো নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর, আমরা কি অন্যের কৌশলের অংশ হব, নাকি নিজেদের কৌশল নিজেরাই নির্ধারণ করব? ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসী নেতৃত্ব, দক্ষ কূটনীতি, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং এমন একটি রাষ্ট্রদর্শন, যা পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। বৈশ্বিক মেরুকরণের যুগে টিকে থাকবে সেই দেশ, যে দেশ কোনো বলয়ের অন্ধ অনুসারী হবে না; বরং নিজের স্বার্থকে কেন্দ্র করে প্রতিটি বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। বাংলাদেশের সামনে আজ সেই কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় পথই উন্মুক্ত। তবে এটাও ঠিক, বিশ্ব রাজনীতি কখনো শূন্যতায় দাঁড়িয়ে থাকে না, তাই কখন যে কি হয় তা বলা খুবই কঠিন। 

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ