শিক্ষানীতির বড় ঘাটতি হচ্ছে ব্যবস্থাপনা

রায়হান আহমেদ তপাদার:

মতামত

যেকোন দেশের টেকসই উন্নয়নে শিক্ষাই হচ্ছে মূল চালিকা শক্তি কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা বারবার হোঁচট

2026-08-17T13:23:41+06:00
2026-08-17T13:23:41+06:00
সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

শিক্ষানীতির বড় ঘাটতি হচ্ছে ব্যবস্থাপনা
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১:২৩ পিএম   (ভিজিট : ০)

যেকোন দেশের টেকসই উন্নয়নে শিক্ষাই হচ্ছে মূল চালিকা শক্তি কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা বারবার হোঁচট খাচ্ছে। যা মোটেও কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশের শিক্ষা হয়ে গেছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। শিক্ষার উদ্দেশ্য যেখানে শেখা, সেখান থেকে আমরা দূরে সরে গেছি। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কতটা শিখছে, এর চেয়ে আমরা দেখছি, পরীক্ষায় কত নম্বর পাচ্ছে। আবার শিখন পদ্ধতি এখন মুখস্থনির্ভর। যে শিক্ষার্থী যতটা মুখস্থ করতে পারে এবং তা পরীক্ষার খাতায় যতটা তার প্রতিফলন ঘটাতে পারছে, সে-ই ভালো করছে। এখানেও তার শিখন উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। সুতরাং এখানে সিস্টেমের সমস্যা। এই সমস্যা পাবলিক পরীক্ষায় এসে ধরা পড়লেও তার সূচনা হয় আসলে প্রাথমিকে। প্রাথমিকের দুর্বল ভিত্তি নিয়ে যে শিক্ষার্থী ওপরের দিকে ওঠে, সে অন্যান্য শ্রেণিতে নানাভাবে পার পেলেও পাবলিক পরীক্ষায় এসে আর যেনতেনভাবে পাস করতে পারে না। প্রাথমিকের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই যে রিডিং পড়তে পারে না, তা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বলতার চিত্রও গবেষণায় বারবার উঠে আসছে। এ বছরও এসএসসি ও সমমানের ফল বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীরা অকৃতকার্য হয়েছে বেশি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিখন ঘাটতিসহ নানা সংকট, ১৯ বছরে সর্বনিম্ন পাস। সুতরাং পাসের হার বাড়াতে হলে প্রাথমিক স্তর থেকেই নজর দিতে হবে। শিক্ষার্থী অর্জন-উপযোগী যোগ্যতা কিংবা প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না কেন-তার উত্তর খুঁজে সেখানে কাজ করতে হবে। আমাদের শিক্ষকদের যোগ্যতার প্রশ্ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিক্ষার্থীদের শিখন- শেখানোর পদ্ধতিতেও সমস্যা রয়ে গেছে। সমস্যা আছে মূল্যায়নেও। 

এসএসসির গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় শতভাগ না হলেও কাছাকাছি সংখ্যক শিক্ষার্থীর পাস করা অসম্ভব নয়। সে জন্য ব্যবস্থায় হাত দিতে হবে। একসময় আমরা বিশ্বাস করতাম ভালো নম্বরই ভালো শিক্ষার প্রমাণ। মুখস্থ বিদ্যা, পরীক্ষার খাতা, আর ফলাফল এই ছিল শিক্ষার চৌহদ্দি। কিন্তু আজকের পৃথিবী ভিন্ন। এখন আর কেবল কে বেশি জানে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং কে জানাকে কাজে লাগাতে পারে, সেটিই আসল যোগ্যতা। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিই জন্ম দিয়েছে এক বিপ্লবাত্মক ধারণা- ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা। বাংলাদেশেও এখন এই ধারণা ধীরে ধীরে মূলধারার শিক্ষায় জায়গা করে নিচ্ছে। ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার লক্ষ্য শুধু বই শেষ করা নয়, বরং শিক্ষার্থীর মধ্যে বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধ গড়ে তোলা। বাংলাদেশে ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা নতুন নয়, তবে এর কার্যকর প্রয়োগ শুরু হয়েছে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিশ্চিত করছে একজন ছাত্র ডিগ্রি অর্জনের পর কেবল পাস নয়, বরং ‘দক্ষ’ হয়ে বেরিয়ে আসছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই পরিবর্তন দরকার ছিল? আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভরতা ও তত্ত্বনির্ভর মূল্যায়ন আধিপত্য করেছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করলেও বাস্তবজীবনে দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে পড়ে। জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ নতুন তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু তাদের মধ্যে ৪০%-এর বেশি কর্মদক্ষতার মানে ঘাটতি রয়েছে। ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা সেই ঘাটতি পূরণের দিকেই এক বড় পদক্ষেপ। এটি শিক্ষার্থীকে শেখায় চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে, প্রয়োগ করতে। সম্প্রতি এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ যা গত বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ কম এবং দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। 

শুধু পাসের হার কমেছে এটুকু বলেই বিষয়টি শেষ করার সুযোগ নেই। কারণ ফলাফলের ভেতরে লুকিয়ে আছে শিক্ষার মান, ধারাবাহিকতা, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতার চিত্র। বিশেষ উদ্বেগের বিষয়, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফল। বিষয় দুটিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। অথচ ইংরেজি ও গণিত কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবন এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য দুটিই মৌলিক দক্ষতার অংশ। বছরের পর বছর ধরে এই দুই বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা থাকলেও কার্যকর সমাধান না হওয়া আমাদের শিক্ষানীতির বড় ঘাটতিকে নির্দেশ করে। অবশ্য এবারের ফলাফলকে শুধু শিক্ষার্থীদের অমনোযোগ বা শিক্ষকদের ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ দুই বছর কেটেছে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে। ক্লাসে অনিয়ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষকের যোগাযোগের দুর্বলতা তাদের শেখার ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া; একটি শ্রেণিতে শেখার ঘাটতি পরবর্তী শ্রেণিতে গিয়ে আরও বড় ঘাটতিতে পরিণত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম ও নানা ডিজিটাল কনটেন্ট শিক্ষার্থীদের সময় ও মনোযোগের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে শিক্ষার শক্তিশালী সহায়ক হতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার যখন পড়াশোনার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা বিপদের কারণ। পরিবারকেও এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হতে হবে। সন্তান কতক্ষণ অনলাইনে থাকছে, কী দেখছে এবং পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছে কি না এসব বিষয়ে অভিভাবকের সচেতনতা জরুরি। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষার্থীদের মানসিক জগতের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া। 

কৈশোরে রাজনৈতিক সংঘাত, সামাজিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তাদের মনোযোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ফলাফল বিশ্লেষণে শিক্ষার্থীর চারপাশের সামাজিক ও মানসিক পরিবেশকেও বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যদিকে কিছু বিষয়ে ভালো ফল প্রমাণ করে যে, শিক্ষার্থীদের সক্ষমতার ঘাটতি সর্বত্র সমান নয়। আইসিটিতে অধিকাংশ বোর্ডে প্রায় শতভাগ পাস এবং পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও উচ্চতর গণিতেও সন্তোষজনক ফল হয়েছে। একই সঙ্গে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস না করা এবং ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাসের ঘটনা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বৈষম্যের বিষয়টিও সামনে এনেছে। এই ফলাফল তাই আতঙ্ক ছড়ানোর চেয়ে আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করুক। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার কারণ খুঁজে অঞ্চল, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফল হচ্ছে, সেখানে বিশেষ সহায়তা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত মূল্যায়ন ও শিক্ষার্থী-অভিভাবক সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষার আগে নয়, বছরজুড়েই সহায়ক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য যেন শুধু পাসের হার বাড়ানো না হয়। মুখস্থনির্ভরতা কিংবা নম্বরের প্রতিযোগিতা নয়, শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখা, যুক্তিবোধ, ভাষাগত দক্ষতা ও গণিতভীতি দূর করাই হওয়া উচিত শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য।যা হোক, আমরা এসএসসি পরীক্ষায় কৃতকার্য ছাত্রছাত্রীদের অবশ্যই অভিনন্দন জানাই। আর যারা এবার কৃতকার্য হতে পারেনি তাদের বলব এ ব্যর্থতাকে গায়ে না মাখাই ভালো। বরং ফল ভালো না হওয়ার কারণগুলো খতিয়ে দেখে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সংকটের সময় আবেগপ্রবণ না হয়ে যুক্তি ও বাস্তব বুদ্ধি খাটিয়ে পথ চলাই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। 

তবে এই পরিবর্তন শুরু হোক শিক্ষকের হাত ধরে ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা সফল করতে হলে প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন যদি নিয়মিত ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা কর্মশালা চালু করে, তবে শিক্ষকরা নতুন পদ্ধতিতে আরও দক্ষ হবেন। যেমন: প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খগঝ বাধ্যতামূলক করা, ফলাফল ম্যাপিং সফটওয়্যার তৈরি করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবভিত্তিক প্রজেক্ট বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মনে রাখতে হবে- ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা কোনো ফরম নয়, এটি একটি চিন্তার পরিবর্তন। বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের পথে। এই অভিযাত্রায় ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা হতে পারে সবচেয়ে বড় ভিত্তি। কারণ এই পদ্ধতি তৈরি করে চিন্তাশীল নাগরিক, দক্ষ কর্মী এবং নৈতিক নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন তরুণ প্রজন্ম। একজন ফলাফলভিত্তিক শিক্ষার্থী শুধু চাকরি খোঁজে না, বরং চাকরি তৈরি করতে শেখে। আজ যখন বিশ্ব এগিয়ে চলছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দিকে, তখন মুখস্থনির্ভর শিক্ষা আমাদের আর এগিয়ে নিতে পারবে না। প্রয়োজন এমন শিক্ষা যা চিন্তা, প্রয়োগ, উদ্ভাবন এই তিন স্তম্ভে দাঁড়ানো। ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা সেই দরজা খুলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি একযোগে এই পথে হাঁটে, শিক্ষকরা যদি সত্যিকারের পরামর্শদাতা হয়ে ওঠেন, আর শিক্ষার্থীরা যদি শেখার আনন্দ আবিষ্কার করেন, তবে একদিন মুখস্থনির্ভর বাংলাদেশ থেকে আমরা হব, দক্ষ ও চিন্তাশীল বাংলাদেশ। এটাই হোক আমাদের পরবর্তী শিক্ষাবিপ্লবের জয়যাত্রা।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ