শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি প্রয়োজন, অপরাজনীতি নয়

তিথী দেবনাথ

মতামত

অন্ধকার থেকে আলোর পথে, অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানে, সংকীর্ণতা থেকে মুক্তচিন্তায় এবং পশ্চাৎপদতা থেকে উন্নতির পথে মানুষকে এগিয়ে নেয়

2026-08-10T15:35:04+06:00
2026-08-10T15:35:04+06:00
সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি প্রয়োজন, অপরাজনীতি নয়
তিথী দেবনাথ
প্রকাশ: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৩৫ পিএম   (ভিজিট : ৩)

অন্ধকার থেকে আলোর পথে, অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানে, সংকীর্ণতা থেকে মুক্তচিন্তায় এবং পশ্চাৎপদতা থেকে উন্নতির পথে মানুষকে এগিয়ে নেয় শিক্ষা। অন্যদিকে একটি রাষ্ট্র পরিচালনা, মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও কল্যাণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে রাজনীতি। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষা ও রাজনীতি—দুটিরই ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু যখন রাজনীতির বিরূপ প্রভাব শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে শুরু করে, তখন শিক্ষা তার মূল সৌন্দর্য ও উদ্দেশ্য হারায়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘শিক্ষা বনাম রাজনীতি’র আলোচনা। বর্তমানে শিক্ষা যেন অনেক ক্ষেত্রেই রাজনীতির শিকার হয়ে উঠেছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়। একটি বিদ্যালয়, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে ভবিষ্যতের অসংখ্য স্বপ্ন পরম যত্নে লালিত হয়। কেউ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে, কেউ প্রকৌশলী; কেউ শিক্ষক, গবেষক কিংবা সাহিত্যিক। আবার কেউ দেশের মানুষের সেবা করার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যায়। পারিপার্শ্বিকতা ও জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়েই সেই স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবতার রূপ নেয়। তাই শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ হওয়া উচিত শান্ত, নিরাপদ, স্বাধীন ও সৃজনশীল।

অপরদিকে রাজনীতি কখনোই নেতিবাচক কোনো বিষয় নয়। বরং বাংলাদেশের মতো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনীতি মানুষের অধিকার ও মতপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। একটি দেশের উন্নয়ন, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন ও বিচারব্যবস্থা—সবকিছুর ওপর রাজনীতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। সৎ, দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতি যেমন একটি দেশকে এগিয়ে নিতে পারে, তেমনি রাজনীতি যখন আদর্শ ও জনসেবার পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার লড়াই ও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তার ক্ষতিকর প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষাঙ্গনও এর বাইরে নয়।

ইতিহাসের পাতায় তাকালেও দেখা যায়, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ—দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর সাক্ষ্য বহন করে শিক্ষা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তারা রাজপথে দাঁড়িয়েছে। তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা জাতির ইতিহাসে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে।

তাই শিক্ষাক্ষেত্রকে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতি ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা কোনো সমাধান হতে পারে না। তবে এখানে রাজনৈতিক সচেতনতা এবং দলীয় রাজনীতি এক বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থী দেশের রাজনীতি সম্পর্কে জানবে, ইতিহাস পড়বে, সংবিধান ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে, বিভিন্ন মতাদর্শ সম্পর্কে ধারণা রাখবে এবং ভিন্নমতকে সম্মান করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন তাকে কোনো দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তখনই সমস্যা তৈরি হয়। শিক্ষার্থীর মুক্তচিন্তার পরিধি সংকুচিত হয়ে যায়। সে নিজের বিবেক দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে অন্যের নির্দেশ অনুসরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

শিক্ষাঙ্গনে অপরাজনীতির প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার পরিবেশ। দলাদলি, সংঘাত, হুমকি, ক্ষমতার প্রদর্শন, মিছিল কিংবা বিভিন্ন ধরনের চাপ শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনায় বাধা সৃষ্টি করে। এমনকি এসব কারণে তাদের মধ্যে মানসিক চাপও তৈরি হয়। পড়াশোনায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কখনো কখনো তৈরি হয় সেশনজট, যার ভুক্তভোগী হন শিক্ষার্থীরাই।

যে সময়ে শ্রেণিকক্ষে বসে জ্ঞান অর্জন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার কথা, তখন কোনো শিক্ষার্থীকে যদি রাজনৈতিক বিরোধ বা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়, তার মনোযোগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। এভাবে শিক্ষাজীবনের মূল্যবান সময়ও অনেক ক্ষেত্রে অপচয় হয়ে যায়।

একজন শিক্ষিত মানুষ রাজনীতিতে এলে তার মধ্যে যুক্তিবোধ, নৈতিকতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ থাকার কথা। সে ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করবে—এটাই প্রত্যাশা। তাই রাজনীতিকে উপেক্ষা করে নয়, বরং শিক্ষার আলোয় রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করা প্রয়োজন।

একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তার মেধা, মনন ও মানবিকতা। তার হাতে থাকবে বই, চোখে থাকবে স্বপ্ন, মনে থাকবে জানার আকাঙ্ক্ষা এবং হৃদয়ে থাকবে দেশপ্রেম। সে অন্যের মতামতকে সম্মান করবে, নিজের মত প্রকাশ করবে এবং যুক্তির মাধ্যমে সত্য খুঁজে নেবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেন বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা ও মানবিক সম্পর্ককে নষ্ট না করে—এই শিক্ষাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই পাওয়া উচিত।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বিবেক জাগ্রত করবেন। তিনি শেখাবেন কীভাবে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে হয়, কীভাবে ভিন্নমতকে সম্মান করতে হয় এবং কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ও যুক্তিসঙ্গত অবস্থান নিতে হয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তখনই সফল হয়, যখন সেখান থেকে কেবল উচ্চশিক্ষিত মানুষ নয়, দায়িত্বশীল, মানবিক ও সচেতন নাগরিকও গড়ে ওঠে।

রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ সুন্দর রাখা। শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক মত প্রকাশের অধিকার যেমন সম্মান করতে হবে, তেমনি তাদের শিক্ষার অধিকার ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় যেন একজন শিক্ষার্থীর মেধা, ভবিষ্যৎ বা স্বাধীন চিন্তার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও নৈতিকতায়—ক্ষমতা, প্রভাব বা আধিপত্য প্রদর্শনে নয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেবল সংসদে নয়, শ্রেণিকক্ষেও তৈরি হয়। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তাদের মানসিকতা ও মূল্যবোধের ওপরই আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের বড় একটি অংশ নির্ভর করে। শিক্ষাঙ্গন যদি অপরাজনীতির কারণে বিভাজনের জায়গায় পরিণত হয়, তবে সেই বিভাজন একদিন বৃহত্তর সমাজেও ছড়িয়ে পড়বে। আর যদি শিক্ষাঙ্গনে যুক্তি, সহনশীলতা, মানবিকতা ও নৈতিকতার চর্চা হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ সমাজও হবে আরও সুন্দর ও সহনশীল।

তাই প্রশ্নটি আসলে ‘শিক্ষা নাকি রাজনীতি’—এমন হওয়া উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেমন শিক্ষা এবং কেমন রাজনীতি? আমরা এমন শিক্ষা চাই, যা মানুষকে শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত করবে না; বরং প্রকৃত অর্থে ভালো মানুষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। আবার এমন রাজনীতি চাই, যা তরুণদের স্বপ্ন কেড়ে নেবে না; বরং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করবে।

শিক্ষা যেখানে জাতির মেরুদণ্ড, সুস্থ রাজনীতি সেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম চালিকাশক্তি। একটি দুর্বল হলে অন্যটির পথও জটিল হয়ে যায়। তাই শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির নামে অস্থিরতা নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সচেতনতা। দলীয় আধিপত্য, সংঘাত ও ক্ষমতার প্রদর্শনের পরিবর্তে স্বাধীন চিন্তা, সংলাপ, সহনশীলতা ও নেতৃত্বের শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক হওয়া উচিত সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ। শিক্ষা মানুষকে আলো দেখায়, আর রাজনীতি সেই আলোয় রাষ্ট্রের পথ নির্ধারণ করে। তাই শিক্ষা ও রাজনীতি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং তাদের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় ও সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। শিক্ষার্থীদের মনে থাকবে মুক্তচিন্তার বিকাশ, হৃদয়ে থাকবে মানবিকতা এবং স্বপ্নে থাকবে একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ দেশ। সেই শিক্ষিত, সচেতন ও মানবিক প্রজন্মই একদিন এমন রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে মানুষের মূল্য বেশি, দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থই প্রধান এবং প্রতিহিংসার চেয়ে মানবিকতাই অধিক শক্তিশালী।


লেখক: শিক্ষার্থী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ( ইংরেজি বিভাগ) 

ডেল্টা টাইমস/ আরএফ 








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ