বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। কৃষির টেকসই উন্নয়ন, কৃষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ উদ্যোগে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে চালু করা হয়েছে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি। যা দেশের কৃষি ব্যবস্থাপনায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।কৃষি একটি দেশের অন্যতম চালিকাশক্তি। এর আওতায় রয়েছে শস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান প্রায় ১১ শতাংশ। মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪২ শতাংশ এ খাতে নিয়োজিত রয়েছে। দেশে প্রায় ১ কোটি ৬৯ লক্ষ কৃষি খানা রয়েছে যাদের প্রধান জীবিকাই কৃষি। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। তাই কৃষিখাতের উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।
কৃষক কার্ড একজন কৃষকের পেশাগত পরিচয় বহন করবে। কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কৃষকের প্রয়োজনীয় তথ্য সন্নিবেশিত থাকবে, যার মাধ্যমে একজন কৃষক বিভিন্ন ধরনের কৃষিসেবা, সহায়তা ও ভর্তুকিসহ ডিজিটাল ও অন্যান্য সেবা গ্রহণ করবেন। এই কার্ডের সংরক্ষিত কৃষকের তথ্যাদি www.farmerscard.gov.bd ওয়েবসাইট ও অ্যাপের মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকবে। এই কার্ডে সংরক্ষিত কৃষকের তথ্যাদি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশের সকল শ্রেণির কৃষক যিনি জাতীয় পরিচয়পত্রধারী এবং ফসল, মৎস্য বা প্রাণিসম্পদ উৎপাদন, নিজস্ব বা ইজারা/বর্গাকৃত জমিতে কৃষি কার্যক্রম, অথবা সরকার ঘোষিত কোনো কৃষি কাজের সাথে সরাসরি যুক্ত তিনি কৃষক কার্ডের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন। কৃষক কার্ড কেবল একটি পরিচয়পত্র নয় বরং এটি কৃষকের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের পরিচয়, ব্যাংকিং সুবিধা এবং কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সেবা একই প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত হবে। এর ফলে প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করা সহজ হবে এবং সরকারি সহায়তা আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
বর্তমানে কৃষকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি, প্রণোদনা, কৃষিঋণ, প্রশিক্ষণ, সেচ সুবিধা ও কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তথ্যের সমন্বয় ও প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষক কার্ড চালুর মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ অনেকাংশে দূর হবে। কৃষক কার্ডের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড হিসেবেও ব্যবহৃত হবে। সরকার নির্ধারিত ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকের হিসাব খোলা হবে এবং সেই হিসাবের সঙ্গে কার্ডটি সংযুক্ত থাকবে। ফলে সরকারি ভর্তুকি, প্রণোদনা কিংবা অন্যান্য আর্থিক সহায়তা সরাসরি কৃষকের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমবে, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও আরও শক্তিশালী হবে।
প্রতিটি নিবন্ধিত কৃষক একটি ১৪ ডিজিটের ইউনিক কৃষক আইডি পাবেন, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ভৌগোলিক কোডের ভিত্তিতে তৈরি হবে। এর মাধ্যমে একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় কৃষক ডাটাবেজ গড়ে উঠবে, যা ভবিষ্যতে কৃষি পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা মোট ১০ টি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। সেবাগুলো হলো- সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার, উন্নতমানের বীজ ও কৃষি উপকরণ সংগ্রহ, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে সহায়তা, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা গ্রহণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বীমা, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং মোবাইল ফোনে আবহাওয়া, বাজারদর ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনায় কৃষক কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কৃষক তার নিজস্ব তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করতে পারবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেসব তথ্য ব্যবহার করে দ্রুত সেবা প্রদান করতে পারবেন। এতে সরকারি সেবার গতি যেমন বাড়বে, তেমনি তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণও সহজ হবে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষি খাতের ডিজিটাল রূপান্তর আরও ত্বরান্বিত হবে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কৃষককে কেবল উৎপাদক হিসেবে দেখা হলেও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে তাঁর একটি স্বীকৃত পেশাগত পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হবে। কৃষক হিসেবে তাঁর পরিচয়, তথ্য এবং সরকারি সেবার অধিকার একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আসবে। এর ফলে কৃষকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন আরও সুদৃঢ় হবে।
সরকার ধাপে ধাপে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রি-পাইলটিং ও পাইলটিং কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলায় কৃষক কার্ড কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। এ লক্ষ্যে আগস্ট ২০২৬ এর মধ্যে দেশের ১৫টি উপজেলার সকল কৃষি ব্লকে বাস্তবায়ন করা হবে। বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহ নিবিড়ভাবে কাজ করবে, যাতে প্রকৃত কৃষকরা সহজেই এই সেবার আওতায় আসতে পারেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, “আগামী চার বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সকল কিষাণ-কিষাণী কৃষক কার্ড পাবেন, ইনশাআল্লাহ। আমাদের এই উদ্যোগের সমান্তরালে জাতিসংঘ ও এর অঙ্গসংস্থা, Food and Agriculture Organization (FAO) এ বছরকে The International Year of the Woman Farmer 2026 হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই কার্ডের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ১০টি কৃষি সেবা প্রদান করা হবে, যা কৃষির অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সঠিক পরিকল্পনা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা কৃষি খাতকে আরও এগিয়ে নিতে পারব।”
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এখন প্রয়োজন উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিশ্চিত করা। কৃষক কার্ড সেই লক্ষ্য পূরণে একটি কার্যকর ভিত্তি তৈরি করবে। তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং ডিজিটাল সেবা প্রদানের মাধ্যমে কৃষকের সময়, ব্যয় ও ভোগান্তি কমবে। একই সঙ্গে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমও আরও ফলপ্রসূ হবে। কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার এমন একটি কৃষিবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে কৃষকের প্রয়োজনীয় সেবা একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে সহজলভ্য হবে। কৃষকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার বিকাশে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় কৃষক কার্ড নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী উদ্যোগ। কৃষকের হাতে যখন ডিজিটাল পরিচয়, স্বচ্ছ সেবা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা একসঙ্গে পৌঁছে যাবে, তখন দেশের কৃষি খাত আরও শক্তিশালী হবে, কৃষকের জীবনমান উন্নত হবে এবং জাতীয় উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে। এটাই সবার প্রত্যাশা।
(পিআইডি ফিচার)লেখকঃ সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা
ডেল্টা টাইমস/ আরএফ