জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো তখনও শেষ হয়নি। রাজপথে আন্দোলন, চারদিকে উত্তেজনা। এর মধ্যেই ডিবি কার্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে তৎকালীন ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের খাবার খাওয়ার ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ছবিটি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও। এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে, হারুনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছিলেন তিনি।জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার একটি অডিও ফোনালাপের প্রতিলিপি থেকে উঠে এসেছে এমন তথ্য। বুধবার ( ১২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ ওই কথোপকথনের প্রতিলিপি উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। এতে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে নিজের বদলি ঠেকানোর অনুরোধ করতে শোনা যায় হারুন অর রশীদকে।
ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত কথোপকথনে হারুন দাবি করেন, আন্দোলনের সমন্বয়কদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে খাবার খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত তার নিজের ছিল না। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও এসবি প্রধানের নির্দেশেই খাবারের ব্যবস্থা করা এবং ছবি তোলা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন ট্রাইব্যুনালকে জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে করা মামলায় যুক্তিতর্কের সময় প্রমাণ হিসেবে বিভিন্ন ফোনালাপের কথোপকথন উপস্থাপন করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে। আন্দোলন তখন ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল। কয়েকজন সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার পর তাদের ডিবি কার্যালয়ে খাবার খাওয়ানো হয়। পরে সেই মুহূর্তের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিতে হারুন অর রশীদের সঙ্গে আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ককে একই টেবিলে বসে খাবার খেতে দেখা যায়।
ছবিটি প্রকাশের পরই শুরু হয় নানা আলোচনা। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে, আটক শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আন্দোলন থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ডিবির পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, সমন্বয়কদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা হচ্ছে।
কিন্তু বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও অস্বস্তি তৈরি করেছিল। ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত ফোনালাপের প্রতিলিপি অনুযায়ী, শেখ হাসিনা বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং হারুনকে ডিবিপ্রধানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য হারুনকে ডিবি থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও সেটি হয়েছিল অন্যভাবে। ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই তাকে ডিবিপ্রধানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়।
এদিকে নিজের বদলি ঠেকাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন হারুন। কথোপকথনে তিনি সমন্বয়কদের খাবার খাওয়ানোর বিষয়টি নিজের সিদ্ধান্ত ছিল না বলে ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি তার অবস্থান ধরে রাখার অনুরোধ করেন।
জুলাইয়ের সেই কয়েকটি দিনেই যেন বদলে যাচ্ছিল ক্ষমতার ভেতরের হিসাব-নিকাশ। রাজপথে আন্দোলন যত তীব্র হচ্ছিল, ততই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা ও দায়িত্ব পালনের ধরন নিয়ে তৈরি হচ্ছিল টানাপোড়েন। সমন্বয়কদের সঙ্গে ডিবি কার্যালয়ে খাবারের ছবিটিও হয়ে উঠেছিল সেই সময়ের অন্যতম আলোচিত প্রতীক।
এরপর আসে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ। আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। কিন্তু জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ থেমে যায়নি। বরং সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসতে শুরু করে সেই সময়ের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, ফোনালাপ ও পর্দার আড়ালের কথোপকথন।
এবার ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত হারুন ও ওবায়দুল কাদেরের কথোপকথনের প্রতিলিপি সেই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনল। অর্থাৎ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান শেষ পর্যন্ত সফল না হলেও ডিবি কার্যালয়ে সমন্বয়কদের সঙ্গে খাবারের ছবি প্রকাশের ঘটনাটি হারুন অর রশীদের জন্য পদ হারানোর কারণ হয়ে উঠতে পারত, এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে ওই কথোপকথনে।
ডেল্টা টাইমস/ আরএফ