জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের (বিবিএন) মধ্যে আঞ্চলিক ঐক্য জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁরা বলেছেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও অভিযোজন অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে হবে। জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিত, উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় ঝুঁকিপ্রবণ দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরতে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপরও তাঁরা গুরুত্ব দেন।
শনিবার (০৭ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ-৩১) সামনে রেখে সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স-বাংলাদেশ (সিজেএ-বি), ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন, সচেতন সংস্থা, শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (এসডিএস), এবিসিডি ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি সংগঠন এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সভাপতিত্ব করেন সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী ও সিজেএ-বির সমন্বয়ক মো. শামসুদ্দোহা।
স্বাগত বক্তব্যে শামসুদ্দোহা বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা এলডিসি উত্তরণ জলবায়ু ঝুঁকি কমায় না, জলবায়ু অভিঘাত মোকাবেলার সক্ষমতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ায় না। ভুটান ইতিমধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণ করেছে, বাংলাদেশ ও নেপাল উত্তরণ প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তিনটি দেশই উল্লেখযোগ্য জলবায়ু ঝুঁকির মুখে। তাই সরকার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সম্মিলিত অ্যাডভোকেসি এবং সমন্বিত অভিযোজন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
এসডিএসের নির্বাহী পরিচালক রাবেয়া বেগম বলেন, এলডিসি উত্তরণকে জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণতা থেকে উত্তরণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। উন্নয়ন অগ্রগতির অজুহাতে আন্তর্জাতিক অভিযোজন সহায়তা প্রত্যাহার করা উচিত নয়। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, উন্নত দেশ ও বহুপক্ষীয় জলবায়ু অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সভাপতি আমিনুর রসুল বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর অভিযোজনের প্রয়োজন ও বেঁচে থাকার অধিকার উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থের অধীন হতে পারে না। বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় অভিন্ন স্বার্থ তুলে ধরতে তিনি যৌথ অ্যাডভোকেসির আহ্বান জানান।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, কপ-৩১ ও পরবর্তী সময়ে ন্যায্য অভিযোজন সহায়তা ও জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক অ্যাডভোকেসি জোরদার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়ও জরুরি।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, অভিযোজন ও প্রশমন জলবায়ু কার্যক্রমের দুটি পরিপূরক স্তম্ভ। অভিযোজন বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করা উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার অংশ।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ বলেন, অর্থনৈতিক উত্তরণকে জলবায়ু ঝুঁকির অবস্থান থেকে আলাদাভাবে দেখতে হবে। তিনি জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালকে অনুদানভিত্তিক অভিযোজন অর্থায়নের দাবিতে আপসহীন অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিআরডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি) সুমাইয়া বিনতে আনোয়ার। তিনি প্রচলিত উন্নয়ন সূচকের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি ও ভবিষ্যৎমুখী জলবায়ু ঝুঁকিকে যথাযথ স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক অভিযোজন ও জলবায়ু অর্থায়ন কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান।
আরও বক্তব্য দেন সচেতন ফাউন্ডেশনের হাবিবুর রহমান, রিভারাইন পিপলের মো. আনোয়ার হোসেন, সচেতন সংস্থার সাকিলা পারভীন, মৃত্তিকা সমাজ উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানের খাদিজা খানম ও সিপিআরডির গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শেখ নূর আতায়া রাব্বি প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে কপ-৩১ ও পরবর্তী সময়ে তিন দেশের স্বার্থ রক্ষায় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তিনটি নীতিগত দাবি তোলা হয়:১. বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণতা, ন্যায্যতা ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে সহায়তা নির্ধারণ করা।
২. এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও ঝুঁকিপ্রবণ দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অভিযোজন অর্থায়ন অব্যাহত রাখা এবং এ অর্থায়নে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৩. বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের মধ্যে অভিন্ন আঞ্চলিক অ্যাডভোকেসি ও আলোচনাভিত্তিক কর্মসূচি গড়ে তোলা।