প্রকাশ: রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ৫:৫৬ পিএম (ভিজিট : ১২)

সংগৃহীত ছবি
উপকূলের সংকট সমাধানে সর্বদলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও প্রাণ-প্রকৃতি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য সব রাজনৈতিক দলকে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে।
রোববার (০১ নভেম্বর) শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম আয়োজিত ‘কোস্টাল ক্লাইমেট ডায়ালগ’ অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। উপকূলীয় জনগণের নীতিগত প্রস্তাবনা ‘উপকূল ঘোষণা’ আগামী বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ-৩১)-এ তুলে ধরার দাবিতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল লতিফ। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চল সীমাহীন সংকটে রয়েছে। বিশাল উপকূলীয় অঞ্চলকে পিছিয়ে রেখে জাতীয় অগ্রগতি সম্ভব নয়। উপকূলের সংকট সমাধানে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সভাপতি আমিনুর রসুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন বলেন, উপকূলের সমস্যা সমাধান ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে এ বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পরিবেশের বিদ্যমান সংকটগুলোর সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
উপকূলের সমস্যা সমাধানে সংসদের ভেতরে ও বাইরে কাজ করার জন্য উপকূলবিষয়ক সংসদীয় ককাস গঠনের প্রস্তাব দেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, দীর্ঘ লড়াই ও গণ-অভ্যুত্থানের পর অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সেগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রতি ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দরবন রক্ষার কথা বলে বনের মধ্যে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা হবে স্ববিরোধী। উপকূলের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় হাসপাতাল নির্মাণ বেশি জরুরি, নাকি উড়োজাহাজ কেনা—সে বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনা করতে হবে।
সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) নির্বাহী প্রধান মো. শামসুদ্দোহা বলেন, উপকূল ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে সর্বদলীয় ঐকমত্য জরুরি। শুধু জলবায়ু সম্মেলনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, নিজেদেরও করণীয় রয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলো জনগুরুত্বপূর্ণ এসব ইস্যুতে প্রায়ই পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেয়। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ন্যায্য হিস্যা আদায়ের পাশাপাশি এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে অভিন্ন অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য উপকূলীয় অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবন দেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি কার্বন শোষণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় উজান থেকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
মূল প্রবন্ধে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশের প্রায় ৩২ শতাংশ ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় চার কোটি মানুষের বসবাস। লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও সুপেয় পানির সংকটের সমাধান না হলে মানুষ জীবিকা ও বসতভিটা হারিয়ে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য হবেন।
তিনি বলেন, উপকূলীয় পরিবেশগত সংকট নিরসনে জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, কৃষি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন, সুন্দরবন সংরক্ষণ এবং দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
সভাপতির বক্তব্যে আমিনুর রসুল কপ-৩১ সম্মেলনে উপকূলের দাবিগুলো তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্রের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাহ ইসরাত আজমেরী, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন কবীর সুমন, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন, সিডিপির চেয়ারম্যান মিহির বিশ্বাস, চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল পারভেজ, কাপ-এর নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার রেবেকা সান-ইয়াত, রি-ওয়েটের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আসিফ মইনুর চৌধুরী, ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সহসভাপতি সাকিলা পারভীন, মেরিন জার্নালিস্টস নেটওয়ার্কের সেক্রেটারি কেফায়েত শাকিল, রিভার বাংলার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ, কসমসের নির্বাহী পরিচালক মেহনাজ মালা, ইকো সোসাইটির পরিচালক মো. জহুরুল ইসলাম, ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ারের জুবায়ের ইসলাম, ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক তানজীম জামান, মৃত্তিকার চেয়ারম্যান খাদিজা খাতুন এবং এবিসিডি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাকিল আহমেদ প্রমুখ।