
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান/ছবি: সংগৃহীত
আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অর্থায়ন সহজ করতে সরকার প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করেছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যেন শুধু অর্থের অভাবে পিছিয়ে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে চায় সরকার।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার যেসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে, তারই ধারাবাহিকতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে এ সোলার এক্সপোর আয়োজন। নিজস্ব উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সোলার এক্সপোতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তা, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, কুইক রেন্টালের নামে লুটপাটের পরিবর্তে সাশ্রয়ী পন্থায় যে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব, এ আয়োজন তার প্রমাণ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনাময় খাত নয়, বরং এক অনিবার্য বাস্তবতা। নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ কয়েকটি বিষয়ে উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করে কয়েকজন আজ পুরস্কৃত হয়েছেন। এ প্রতিযোগিতায় অন্তত ৩০০ মেধাবী তরুণ-তরুণী নতুন ধারণা উপস্থাপন করেছেন।
প্রত্যেককে আন্তরিক সাধুবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামীর বাংলাদেশে জ্ঞানের পাশাপাশি নতুন নতুন উদ্ভাবনী ধারণার প্রতিযোগিতা চলতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি উদ্ভাবনী ধারণাই বাংলাদেশের জন্য গেম চেঞ্জার হতে পারে। অর্থের অভাবে যাতে তারুণ্যের কোনো উদ্ভাবনী ধারণা হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে চলতি বাজেটে স্টার্টআপের জন্য বছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ
দেশকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে ফেলার কারণে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আমদানি প্রক্রিয়ায় মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুতের প্রায় সমপরিমাণ চাহিদা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ডিজেলের মজুত বাড়িয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার সরবরাহ ও মজুত নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এরই মধ্যে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিগত সরকারগুলোর ব্যর্থতা কিংবা ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় সময়ক্ষেপণের পরিবর্তে আগামী দিনে বিদ্যুতের চাহিদা কীভাবে মেটানো যায়, বাসাবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটিই বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে জনগণের ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার সচেতন। চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তি পর্যালোচনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ—এসব বিষয় নিয়ে সরকার একযোগে কাজ করছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সায় কেনার ঘোষণা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে সরকার এরই মধ্যে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতিসহায়তা, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা, সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদগুলো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হবে। নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে নিজস্ব ব্যবহারের পর যারা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে সরকার তাদের কাছ থেকে প্রণোদনাসহ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনবে।
তিনি বলেন, অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে এরই মধ্যে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। উদ্যোক্তাদের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আহ্বান জানানোর আগে তিনি নিজেও বাসায় সৌরপ্যানেল স্থাপন করেছেন। বাসায় ব্যবহারের পর অতিরিক্ত কিছু বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতেও সক্ষম হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি যন্ত্রপাতির দাম কমানো হচ্ছে। সৌরপ্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির আমদানি এবং দেশীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শুধু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, জনগণের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুতের খরচ কমানোও সরকারের অগ্রাধিকার।
৮ হাজারের বেশি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান
সৌরবিদ্যুৎ খাতে যুক্ত ৮ হাজারের বেশি নতুন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পর সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কি না এবং গ্রাহকেরা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়ে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সৌরবিদ্যুতে চলবে কৃষকের সেচপাম্প
কৃষি খাতেও সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষকদের সেচের জন্য সরকার ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্পকে সৌরচালিত সেচপাম্পে রূপান্তরের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, পরিবেশ সংরক্ষিত হবে এবং জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।
একইভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে হিমাগার, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সরকারের দায়িত্ব। অন্যদিকে বিদ্যুতের সঠিক ও সাশ্রয়ী ব্যবহার জনগণের দায়িত্ব। দিনের বেলায় যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ব্যবহারের পাশাপাশি বাসা, অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনে বাতি, পাখা কিংবা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখাও নাগরিকদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
উন্নয়ন সহযোগী ও প্রবাসীদের বিনিয়োগের আহ্বান
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও বিনিয়োগের সহজ সুযোগ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী চান, বাংলাদেশ সোলার এক্সপো কেবল দুই দিনের প্রদর্শনী হয়ে শেষ না হোক। এ আয়োজন থেকে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হোক, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হোক, ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংযোগ তৈরি হোক এবং তরুণেরা প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাক। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের বাস্তব উদ্যোগ গড়ে উঠুক।
তিনি বলেন, সরকার, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হবে না। সবাইকে সূর্যের আলোকে দেশের সম্পদে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
এরপর তিনি ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬’-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই