বিনিয়োগের খরা কাটাতে ঝুঁকি ভাগাভাগির বৈশ্বিক উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

আন্তর্জাতিক

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগের ঘাটতি কমাতে বৈশ্বিকভাবে বিনিয়োগের ঝুঁকি ভাগাভাগির উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)

2026-10-27T20:33:17+06:00
2026-10-27T20:33:17+06:00
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

দোহায় ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম
বিনিয়োগের খরা কাটাতে ঝুঁকি ভাগাভাগির বৈশ্বিক উদ্যোগ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৩ পিএম   (ভিজিট : ১১)

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগের ঘাটতি কমাতে বৈশ্বিকভাবে বিনিয়োগের ঝুঁকি ভাগাভাগির উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানো, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তি সংস্কার এবং ঝুঁকিপ্রবণ অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ ঘোষণা করা হয়েছে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের (ইউএনসিটিএডি) উদ্যোগে কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত নবম ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম ২০২৬–এর উল্লেখযোগ্য ফলাফলের মধ্যে রয়েছে এসব উদ্যোগ। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে আঙ্কটাড। কাতারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ ফোরামে বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকার ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

ফোরামে বিনিয়োগ বিমা খাতে সহযোগিতা জোরদারে বার্ন ইউনিয়নের সঙ্গে অভিপ্রায়-ঘোষণা, ঝুঁকিপ্রবণ অর্থনীতির জন্য নতুন অংশীদারত্ব এবং সম্প্রসারিত সমুদ্র অর্থনীতি তহবিল থেকে সাও টোমে ও প্রিন্সিপেতে প্রথম প্রকল্পে অর্থায়নের ঘোষণাও এসেছে।

আঙ্কটাডের ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ৮০ শতাংশের বেশি গেছে মাত্র ২০টি অর্থনীতিতে। ফলে অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশ বৈশ্বিক বিনিয়োগের সুফল থেকে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে।

সংস্থাটির সর্বশেষ গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ট্রেন্ডস মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়লেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামো, জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও খাদ্যব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে নতুন প্রকল্পের ঘোষণা ২৫ শতাংশের বেশি কমেছে। উচ্চ ঋণব্যয়, প্রকল্প প্রস্তুতির সীমিত সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক, নীতিগত ও মুদ্রাসংক্রান্ত ঝুঁকিকে বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে আঙ্কটাড।

এ পরিস্থিতিতে ‘গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর ইনভেস্টমেন্ট রিস্ক শেয়ারিং’ নামে একটি বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানোর বিভিন্ন ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো, যাতে তুলনামূলকভাবে অবহেলিত বাজারগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি পুঁজি প্রবাহিত হয়। এ উদ্যোগে সরকার, উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান, রপ্তানি ঋণ সংস্থা, বিমা প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে অর্থায়নের পরিবেশ উন্নত করা এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও বেশি প্রকল্পকে আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

রপ্তানি ঋণ ও বিনিয়োগ বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক সংগঠন বার্ন ইউনিয়নের সঙ্গে আঙ্কটাডের অভিপ্রায়-ঘোষণার লক্ষ্যও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিমা এবং ঝুঁকি প্রশমনে সহযোগিতা জোরদার করা।

ফোরামে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতে বিনিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ উন্নয়নশীল দেশগুলো যাতে শুধু কাঁচামাল রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজস্ব প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্প গড়ে তুলতে পারে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ ধনী দেশগুলোতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে ডেটা সেন্টার নির্মাণে ঘোষিত বিনিয়োগ ৩২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার কমেছে।

এ পরিস্থিতিতে আঙ্কটাড, আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগ ‘ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ক্যাটালাইজার’–এ নতুন অংশীদার যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল অবকাঠামো প্রকল্প তৈরি ও অর্থায়ন সংগ্রহে দেশগুলোকে সহায়তা করতে বিনিয়োগবিষয়ক একটি চেকলিস্ট এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির উপকরণ চালু করা হয়েছে।

নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোকে ডিজিটাল ও এআই অবকাঠামোর চাহিদা নিরূপণ, বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি এবং অর্থায়নযোগ্য প্রকল্প গড়ে তুলতে সহায়তা করবে ‘ডিজিটাল অ্যান্ড এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট প্লেবুক’। এটি শিগগির প্রকাশ করা হবে। এ ছাড়া স্বচ্ছতা, টেকসই উন্নয়ন ও জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রাধিকার বিবেচনায় দায়িত্বশীল এআই বিনিয়োগের নীতিমালা তৈরির জন্য একটি নতুন পরিচালনা কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের মহাকাশবিষয়ক দপ্তরের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে মহাকাশ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করতেও সহায়তা করা হবে।

ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রসহ ঝুঁকিপ্রবণ উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো পর্যটন, সমুদ্রভিত্তিক শিল্প ও ডিজিটাল সেবায় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ আকর্ষণে নানা বাধার মুখে পড়ে। এসব দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আঙ্কটাডের সম্প্রসারিত ‘ওশান ইকোনমি অ্যান্ড সিডস ফান্ড’ ভূমিকা রাখবে। এ তহবিল থেকে সাও টোমে ও প্রিন্সিপেতে প্রথম প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে। প্রকল্পটিতে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় পর্যটনের পাশাপাশি পরিবেশ ও ডিজিটাল সেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদন ও এর মূল্য সংযোজনসহ সমুদ্রভিত্তিক নতুন শিল্পেও সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।

জাতিসংঘের পর্যটন সংস্থার সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পর্যটন খাতে বিনিয়োগ-সহযোগিতা জোরদার করা হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকল্প প্রস্তুত করতে দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়া হবে। উন্নয়নশীল দেশের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিনিয়োগকারী, পরামর্শক ও আন্তর্জাতিক বাজারের সংযোগ স্থাপনে চালু হচ্ছে ‘গ্লোবাল ফাউন্ডার্স ফেলোশিপ’।

বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত পূর্বানুমেয়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারগুলোর নিজস্ব উন্নয়ন-অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের সক্ষমতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আঙ্কটাড। এ লক্ষ্যে ‘গাইডিং প্রিন্সিপলস ফর ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট এগ্রিমেন্টস রিফর্ম’ নামে নতুন নীতিমালা চালু করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত স্বাধীনতা বজায় রেখে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তিগুলোকে আধুনিক করা।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সহজীকরণে বিভিন্ন দেশের দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব সংস্কারে রূপ দিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন কারিগরি সহায়তা কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করার মতো সংস্কারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

দোহা ফোরামে ঘোষিত নয়টি চুক্তি ও অংশীদারত্বের মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ ও আঞ্চলিক সংহতিতে আরব লীগের সঙ্গে সহযোগিতা, বিনিয়োগ প্রসারে ক্যারিবীয় বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমিতির সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং বিনিয়োগনীতি ও সহজীকরণে কাতারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা।

আঙ্কটাড ও জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো যৌথভাবে ‘ক্রিয়েটিভইনভেস্ট’ চালু করেছে। এর লক্ষ্য শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য খাতের বিনিয়োগের সুযোগের সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করা। এ ছাড়া বিনিয়োগ ও সবুজ রূপান্তর নিয়ে ‘গ্রিন জোন ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টি, মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নকে বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, তা পর্যালোচনায় গঠন করা হয়েছে ‘বিয়ন্ড জিডিপি’ টাস্কফোর্স।

বৈশ্বিক বিনিয়োগের পরিবর্তনশীল প্রবণতা ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণে ফোরামে তিনটি নতুন আঞ্চলিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এগুলো হলো ক্যারিবীয় বিনিয়োগ প্রতিবেদন ২০২৬, ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন বিনিয়োগ প্রতিবেদন ২০২৬ এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) বিনিয়োগ প্রতিবেদন। প্রতিবেদনগুলোতে বিনিয়োগের কেন্দ্রীভবন, বিভিন্ন অঞ্চলে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের অসম গতি এবং আঞ্চলিক অনিশ্চয়তার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

বিনিয়োগনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দিকনির্দেশনা দিতে স্থায়ী ‘চিফ ইকোনমিস্টস অ্যান্ড ইনভেস্টরস ডায়ালগ’ গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি টেকসই প্রতিবেদন প্রণয়ন ও টেকসই শেয়ারবাজারের বিষয়ে নতুন নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য বিনিয়োগে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীল চর্চা জোরদার করা।

ফোরামে ঘোষিত উদ্যোগগুলো ‘দোহা গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট অ্যাকশন ফ্রেমওয়ার্ক’–এর অংশ। এতে ছয়টি অগ্রাধিকার খাতে ২০টির বেশি ফলাফল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার, বিনিয়োগকারী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে।

আঙ্কটাডের আয়োজনে এবং কাতারের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত নবম ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে তিন দিনে সাত হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চারজন প্রধানমন্ত্রী, ৬০ জনের বেশি মন্ত্রী, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী নেতা, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ও উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং ২০০–এর বেশি আন্তর্জাতিক সাংবাদিক।

আঙ্কটাড জানিয়েছে, এসব প্রস্তাব, নীতিমালা ও অংশীদারত্বকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে অংশগ্রহণকারী সরকার ও সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করবে তারা। এ ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগনীতি সংস্কার ও প্রকল্প উন্নয়নের মাধ্যমে যেসব দেশ ও খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ