জলবায়ু লক্ষ্যে তিন বছরের স্থবিরতা কপ৩১-এর আগে বাড়ছে উদ্বেগ

মো. শফিকুল ইসলাম :

আবহাওয়া ও পরিবেশ

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ২০২৫ সালে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। এক বছরেই যুক্ত হয়েছে ৬৯৩ গিগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন

2026-09-22T11:05:05+06:00
2026-09-22T11:05:05+06:00
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

জলবায়ু লক্ষ্যে তিন বছরের স্থবিরতা কপ৩১-এর আগে বাড়ছে উদ্বেগ
মো. শফিকুল ইসলাম :
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০৫ এএম   (ভিজিট : ০)

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ২০২৫ সালে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। এক বছরেই যুক্ত হয়েছে ৬৯৩ গিগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণ, ব্যাটারি সংরক্ষণে বাড়তি বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির ক্রমহ্রাসমান ব্যয় বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু এই রেকর্ডও ২০৩০ সালের বৈশ্বিক লক্ষ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।

আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (আইআরইএনএ), কপ৩১ সভাপতিত্ব এবং গ্লোবাল রিনিউয়েবলস অ্যালায়েন্সের যৌথ প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের শেষে বিশ্বে মোট স্থাপিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ১৫ টেরাওয়াটে। ২০২৩ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত কপ২৮ সম্মেলনে ১৯৮টি দেশ যে ‘ইউএই কনসেনসাস’-এ সম্মত হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ২০২২ সালের ভিত্তির তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা তিন গুণ বাড়িয়ে ১১ দশমিক ২ টেরাওয়াটে নেওয়া।

বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য সক্ষমতা প্রায় ১০ দশমিক ৬ টেরাওয়াটে পৌঁছাতে পারে—অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা থেকে ঘাটতি থাকবে প্রায় শূন্য দশমিক ৬ টেরাওয়াট বা ৬০০ গিগাওয়াট। এই ঘাটতি অবশ্য আগের হিসাবের তুলনায় কমেছে; ২০২৪ সালের হিসাবে সম্ভাব্য ঘাটতি ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫ টেরাওয়াট, অর্থাৎ গত দুই বছরে বিশ্ব সেই ঘাটতির একটি বড় অংশ পুষিয়ে নিয়েছে। তবু বাকি পাঁচ বছরে আরও প্রায় ৬ দশমিক ০২ টেরাওয়াট নতুন সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে, যার জন্য বছরে গড়ে প্রায় ১ দশমিক ২ টেরাওয়াট নতুন সক্ষমতা প্রয়োজন—২০২৫ সালের ৬৯৩ গিগাওয়াটের প্রায় দ্বিগুণ।

এই ব্যবধান কেবল সংখ্যার নয়, এটি বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রশ্ন। আইআরইএনএর হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের লক্ষ্যে পৌঁছাতে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতার বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হতে হবে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে ২০২৫ সালে তা ছিল ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্ব রেকর্ড গড়লেও প্রয়োজনীয় গতির নিচেই রয়েছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি সৌরবিদ্যুৎ। ২০২৫ সালে সৌর ফটোভোলটাইক (সোলার পিভি) থেকে একাই এসেছে ৫১২ দশমিক ৭ গিগাওয়াট নতুন সক্ষমতা। বিশ্বে মোট স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা এখন ২ হাজার ৩৮৮ গিগাওয়াট, যা মোট নবায়নযোগ্য সক্ষমতার প্রায় ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ। বায়ুবিদ্যুতের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ২৯১ গিগাওয়াট এবং জলবিদ্যুতের ১ হাজার ২৯৬ গিগাওয়াট। ২০২৫ সালে নতুন নবায়নযোগ্য সক্ষমতার প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এসেছে সৌর পিভি থেকে, যেখানে নতুন সংযোজন আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। বায়ুবিদ্যুতেও হয়েছে রেকর্ড—এক বছরে যুক্ত হয়েছে ১৫৮ গিগাওয়াট নতুন সক্ষমতা, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে স্থলভিত্তিক বায়ুবিদ্যুতে যুক্ত হয়েছে ১৫০ গিগাওয়াট এবং সমুদ্রভিত্তিক বায়ুবিদ্যুতে প্রায় ৮ গিগাওয়াট।

তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারে ভৌগোলিক বৈষম্য ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালের শেষে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার হাতে ছিল বিশ্বের মোট স্থাপিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতার ৮৬ শতাংশ। শুধু এশিয়াতেই ২০২৫ সালে যুক্ত হয়েছে ৫১৪ গিগাওয়াটের বেশি নতুন সক্ষমতা—বৈশ্বিক নতুন সংযোজনের প্রায় ৭৪ শতাংশ—এবং মহাদেশটির মোট স্থাপিত সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৯৫ গিগাওয়াটে। অন্যদিকে আফ্রিকায় নতুন সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৩ গিগাওয়াট। যদিও এটি মহাদেশটির জন্য রেকর্ড এবং আগের বছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় তা এখনও নগণ্য। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্ত হয়েছে ১২ দশমিক ৮ গিগাওয়াট (২৯ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি) এবং দক্ষিণ আমেরিকায় ২০ গিগাওয়াট।

বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর ওপর তাই দায়িত্বও বাড়ছে। ২০২৫ সালে জি২০ দেশগুলোতে যুক্ত হয়েছে ৬৫০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা—বৈশ্বিক নতুন সংযোজনের ৯৪ শতাংশ। এসব দেশে মোট স্থাপিত সক্ষমতা এখন ৪ দশমিক ৬ টেরাওয়াট, যা ২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ করে ৯ দশমিক ৪ টেরাওয়াটে নিতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এগোচ্ছে, তবে তাকেও গতি বাড়াতে হবে। ২০২৫ সালে ইইউভুক্ত ২৭টি দেশ যুক্ত করেছে ৭০ গিগাওয়াট নতুন সক্ষমতা, মোট সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৭৭৯ গিগাওয়াটে। ২০৩০ সালের জন্য নির্ধারিত প্রায় ১ দশমিক ৩ টেরাওয়াট লক্ষ্যে পৌঁছাতে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ৯৭ গিগাওয়াট নতুন সক্ষমতা প্রয়োজন হবে।

নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের এই সাফল্যের বিপরীতে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা জ্বালানি দক্ষতায়। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি নিবিড়তা উন্নয়নের হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে ২০২৩ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ৪ শতাংশ উন্নতির লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল। আইআরইএনএর নতুন হিসাব বলছে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এখন প্রয়োজন হবে গড়ে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বার্ষিক উন্নতি—অর্থাৎ আগের চেয়েও দ্রুত।

এখানেই বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের একটি বড় বৈপরীত্য সামনে আসছে। একদিকে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে, ফলে নতুন উৎপাদন ক্ষমতার একটি অংশ বাড়তি চাহিদার কারণে শোষিত হয়ে যাচ্ছে। আইআরইএনএ সতর্ক করেছে, জ্বালানি দক্ষতার উন্নতি না হলে নতুন নবায়নযোগ্য সক্ষমতার বড় অংশই বাড়তি চাহিদা মেটাতে ব্যয় হতে পারে।

এই সমস্যার একটি সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে ‘বিদ্যুতায়ন’ বা অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে বিদ্যুতের আওতায় আনার ধারণা। ভবন, পরিবহন, শিল্প ও তাপ ব্যবস্থায় দক্ষ বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির ব্যবহার একদিকে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে পারে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়াবে। কপ৩১ সভাপতিত্ব ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহারে বিদ্যুতের অংশ ৩৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য সামনে এনেছে।

পরিবহন খাতে পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বৈদ্যুতিক গাড়ি। ২০২৫ সালে বিশ্বে নতুন গাড়ি বিক্রির ২৬ শতাংশই ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ি, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। একই বছরে বিশ্বজুড়ে বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ৪১ লাখ আবাসিক হিট পাম্প, যদিও এই বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ২ শতাংশ কমেছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থনৈতিক যুক্তিও দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২৫ সালে শুধু নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ৬২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া গ্রিড ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নমনীয়তায় ৫২৫ বিলিয়ন, জ্বালানি দক্ষতায় ৩৬২ বিলিয়ন এবং জ্বালানি সংরক্ষণে ১০৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। সৌর, বায়ু, ব্যাটারি ও হাইড্রোজেন প্রযুক্তির কারখানায় বিনিয়োগ হয়েছে ৮১ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ব্যাটারি উৎপাদনেই বিনিয়োগ ৬১ বিলিয়ন ডলার।

এই বিনিয়োগের সুফলও স্পষ্ট। নবায়নযোগ্য জ্বালানির কারণে ২০২৫ সালে বিশ্বে ৮ দশমিক ৪ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এড়ানো গেছে এবং জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যয়ে সাশ্রয় হয়েছে ৪৮০ বিলিয়ন ডলার। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে কয়লা ও গ্যাস আমদানিতে সাশ্রয় হয়েছে ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।

ব্যাটারি সংরক্ষণেও দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ২০২৫ সালে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১১২ গিগাওয়াট বা ৩০৭ গিগাওয়াট-ঘণ্টা ব্যাটারি সংরক্ষণ ক্ষমতা—আগের বছরের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে চীন একাই যুক্ত করেছে ৬১ গিগাওয়াট, যুক্তরাষ্ট্র ১৮ গিগাওয়াট, ইউরোপ ১৬ গিগাওয়াট এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল ১৭ গিগাওয়াট। ব্যাটারি সংরক্ষণের খরচ ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালে কমেছে ৩০ শতাংশ, আর ২০১০ সাল থেকে কমেছে ৯৫ শতাংশ।

তবে শুধু উৎপাদন ও সংরক্ষণ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ গ্রিড এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে পারছে না। নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রিডে সংযোগের অপেক্ষায় পড়ে আছে, আর অনুমোদন প্রক্রিয়ার ধীরগতিও পরিস্থিতি জটিল করছে। আইআরইএনএ বলছে, গ্রিড সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে ব্যর্থতা নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদন ও ব্যবহার—দুই ক্ষেত্রেই বাধা তৈরি করছে।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নমনীয়তার প্রয়োজনও দ্রুত বাড়ছে। প্রতিবেদনের হিসাবে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০৩০ সালে দৈনিক নমনীয়তার প্রয়োজন প্রায় তিন গুণ, সাপ্তাহিক নমনীয়তা আড়াই গুণ এবং মৌসুমি নমনীয়তার প্রয়োজন দ্বিগুণ হতে পারে। অর্থাৎ শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়—কখন বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, কখন ব্যবহার হবে এবং কীভাবে তা সংরক্ষণ করা হবে, এই পুরো ব্যবস্থাকেই নতুন করে সাজাতে হবে। এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ভূমিকাও বাড়ছে—বিদ্যুতের চাহিদা পূর্বাভাস, গ্রিডে জট কমানো, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার তাৎক্ষণিক পরিচালনায় এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে জ্বালানি রূপান্তর এখন আর শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রিড নির্মাণের বিষয় নয়; এটি তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও স্মার্ট গ্রিডের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন অর্থায়ন। উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উচ্চ সুদ, মুদ্রা ঝুঁকি, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি নবায়নযোগ্য প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে যেসব দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, সেসব দেশেই প্রায়ই মূলধনের খরচ সবচেয়ে বেশি পড়ে। এ কারণে আইআরইএনএ ঝুঁকি কমাতে সরকারি গ্যারান্টি, সহজ শর্তের অর্থায়ন ও অন্যান্য আর্থিক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনাতেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব বাড়ছে। এখন পর্যন্ত ১২০টি দেশ নতুন জাতীয় নির্ধারিত অবদান বা এনডিসি ৩.০ জমা দিয়েছে, যার মধ্যে ১০৬টি দেশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর কথা এবং ১০৮টি দেশ জ্বালানি দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু মাত্র ৬৭ শতাংশ দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য রয়েছে, আর জ্বালানি দক্ষতার ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৪৩ শতাংশ।

এদিকে জ্বালানি রূপান্তরের সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান ও দক্ষতার চাহিদাও তৈরি হচ্ছে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, ব্যাটারি, গ্রিড, বৈদ্যুতিক যান, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি দক্ষতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দক্ষ কর্মীর নতুন চাহিদা তৈরি হবে। তাই আইআরইএনএ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, পুনঃদক্ষতা অর্জন এবং নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হলো, শুধু নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত হবে না। আইআরইএনএর মহাপরিচালক ফ্রান্সেসকো লা ক্যামেরা বলেছেন, জ্বালানি দক্ষতায় টানা তৃতীয় বছর অগ্রগতি প্রায় নগণ্য থাকা, প্রত্যাশার চেয়ে বেশি জ্বালানি চাহিদা এবং সক্ষমতা সম্প্রসারণে সম্ভাব্য ধীরগতি—সব মিলিয়ে ইউএই কনসেনসাসের লক্ষ্যগুলোও বিশ্বকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পথে রাখার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।

এই কারণেই আগামী কপ৩১ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ৯ থেকে ২০ নভেম্বর ২০২৬ তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠেয় কপ৩১-এ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি দক্ষতা, গ্রিড, সংরক্ষণ, বিনিয়োগ ও বিদ্যুতায়নের অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হওয়ার কথা। কপ৩১ সভাপতিত্বের ঘোষিত এজেন্ডায় বিদ্যুতায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সঙ্গে ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহারে বিদ্যুতের অংশ ৩৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্যও সামনে রাখা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্বকে একই সঙ্গে দুটি বার্তা দিচ্ছে। প্রথমটি আশাবাদের—নবায়নযোগ্য জ্বালানি আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়, এটি এখন দ্রুত বাড়তে থাকা বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দ্বিতীয়টি সতর্কতার—রেকর্ড প্রবৃদ্ধিও ২০৩০ সালের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বিশ্বকে এখন বার্ষিক ৬৯৩ গিগাওয়াট সংযোজন থেকে প্রায় ১ দশমিক ২ টেরাওয়াটে যেতে হবে, একই সঙ্গে জ্বালানি দক্ষতার বার্ষিক উন্নতি ১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে অনেক ওপরে তুলতে হবে। গ্রিড আধুনিকায়ন, ব্যাটারি ও অন্যান্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সাশ্রয়ী অর্থায়ন, দ্রুত অনুমোদন, দক্ষ জনবল এবং পরিবহন-ভবন-শিল্পে বিদ্যুতায়ন—সবকিছুকে আনতে হবে একই পরিকল্পনার আওতায়।

অর্থাৎ বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের পরবর্তী ধাপ শুধু আরও সৌর প্যানেল বা আরও বায়ু টারবাইন স্থাপনের নয়। আসল চ্যালেঞ্জ এখন উৎপাদন, গ্রিড, সংরক্ষণ, অর্থায়ন, দক্ষতা ও ব্যবহার—পুরো জ্বালানি ব্যবস্থাকে একই গতিতে এগিয়ে নেওয়া। ২০৩০ সালের জানালা যত সংকুচিত হচ্ছে, কপ৩১-এ প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়নের প্রশ্নটিই তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।


ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ