লাটভিয়ার অর্থনীতি কাঠামোগত দুর্বলতা ও ক্রমবর্ধমান সরকারি ব্যয়ের চাপে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। মধ্যমেয়াদে একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজস্ব সংহতকরণ কৌশল না নিলে দেশটির আর্থিক সক্ষমতা ক্ষয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। ব্যয়ের চাপ সামলাতে সম্পত্তি কর বাড়ানো, আয়করের ছাড় কমানো এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায় উন্নত করার সুপারিশ করেছে আইএমএফ।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬) ওয়াশিংটন ডিসি থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইএমএফ জানায়, লাটভিয়ার সঙ্গে ২০২৬ সালের আর্টিকেল ফোর পরামর্শ সম্পন্ন হয়েছে। সংস্থার নির্বাহী পর্ষদ কোনো সভা ছাড়াই ‘ল্যাপস-অব-টাইম’ পদ্ধতিতে স্টাফ মূল্যায়ন অনুমোদন করেছে। লাটভিয়ার কর্তৃপক্ষ স্টাফ প্রতিবেদন প্রকাশে সম্মতি দিয়েছে।
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে লাটভিয়ার অর্থনীতিতে কোনো প্রবৃদ্ধি হয়নি। ২০২৫ সালে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়িয়ে ২ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি ভোগব্যয় মূল ভূমিকা রেখেছে।
একই সময়ে মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। ২০২৫ সালে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সেবা খাতে স্থায়ী মূল্যবৃদ্ধি ও মজুরির জোরালো প্রবৃদ্ধির কারণে মৌলিক (কোর) মূল্যস্ফীতিও উচ্চ ছিল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি চড়া রয়েছে।
আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছর লাটভিয়ার প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ১ দশমিক ৮ শতাংশে নামবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব শক্তিশালী সরকারি বিনিয়োগ, ভোগব্যয়ের পুনরুদ্ধার এবং ঋণপ্রবাহের জোরালো প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে আংশিকভাবে সামাল দেওয়া যাবে। তেল, গ্যাস, সার ও পেট্রোরসায়নের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
সংস্থার সারণি অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সার্বিক মূল্যস্ফীতির গড় ৪ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ শতাংশ হতে পারে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৭ সালে সামান্য বেড়ে ১ দশমিক ৯ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্য উত্তেজনা বৃদ্ধি। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল দ্রুত ছাড় হলে এবং কাঠামোগত সংস্কার ত্বরান্বিত হলে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হতে পারে।
ইউরোজোনের অন্যান্য দেশের তুলনায় লাটভিয়ার মাথাপিছু আয় ধীরে বাড়ছে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। এর কারণ মোট উপাদান উৎপাদনশীলতার দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও সীমিত মূলধন গভীরতা। পাশাপাশি দক্ষতার অমিল ও শ্রমবাজারের জটিলতাও উৎপাদনশীলতাকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
আয়ের এই ব্যবধান কমাতে বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বাড়ানোর সংস্কার দরকার বলে মনে করে সংস্থাটি। আইএমএফের মতে, দেশটির ডিজিটাল অবকাঠামো ভালো হলেও ডিজিটাল দক্ষতার সীমাবদ্ধতা ও প্রতিষ্ঠানপর্যায়ে এআই গ্রহণের নিম্ন হার সুফল পাওয়ার পথে বাধা।
আইএমএফ বলেছে, চাহিদা এখনো সহনশীল এবং মূল্যস্ফীতি উচ্চ থাকায় রাজস্ব নীতি হওয়া উচিত নিরপেক্ষ। জ্বালানি খাতে কোনো সহায়তা দিলে তা হতে হবে সীমিত, সাময়িক এবং কেবল ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক। বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে আরও বিপর্যয় ঘটলে সরকারকে স্বয়ংক্রিয় স্থিতিশীলকারক কাজ করতে দিতে হবে এবং ২০২৭ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে সার্বিক বাজেট ঘাটতি নিম্নমুখী রাখতে হবে।
সংস্থাটি জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ওপর অপ্রত্যাশিত মুনাফা কর (উইন্ডফল ট্যাক্স) আরোপ না করার পরামর্শও দিয়েছে। তাদের যুক্তি, এতে বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে।
আইএমএফের সারণি অনুযায়ী, ইউরোপীয় হিসাবপদ্ধতিতে (ইএসএ) লাটভিয়ার বাজেট ঘাটতি ২০২৫ সালে ছিল জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা ৩ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ২ শতাংশে উঠতে পারে।
মধ্যমেয়াদে সরকারি ঋণ জিডিপির ৫০ শতাংশে স্থির রাখার লক্ষ্য নেওয়ার কথাও বলেছে আইএমএফ। সংস্থাটি বলছে, ছোট ও উন্মুক্ত অর্থনীতি হিসেবে অস্থির প্রবৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিতে ঋণের উচ্চ ব্যয়, ক্রমবর্ধমান ব্যয়চাপ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য দায়ের কারণে এই সতর্কতা প্রয়োজন। সারণি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে লাটভিয়ার সরকারি ঋণ ছিল জিডিপির ৪৬ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০২৭ সালে ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে।
প্রতিরক্ষা, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সবুজ রূপান্তরে বিনিয়োগের কারণে ব্যয়চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্বিতীয় পেনশন স্তর থেকে প্রথম স্তরে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া অবদান ফিরিয়ে দেওয়ার খরচ। ২০২৮ সালে ইইউর জাতীয় জরুরি ছাড়ের ধারা (এসকেপ ক্লজ) শেষ হলে রাজস্ব নীতির ওপর বাধ্যবাধকতাও কড়া হবে।
আইএমএফ বলছে, স্কুল ও হাসপাতাল নেটওয়ার্ক যৌক্তিকীকরণের মতো উপায়ে ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো যেতে পারে। তবে দেশটির স্বাস্থ্যসূচক তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বরং বাড়ানোর প্রয়োজন হবে। ফলে শুধু দক্ষতা বাড়িয়ে ব্যয়চাপ সামলানো যাবে না।
এ কারণে সংস্থাটি রাজস্ব আহরণ বাড়ানোকে সংহতকরণ কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ করার সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সম্পত্তি করের আয় বাড়ানো, আয়করে ছাড় কমানো এবং ভ্যাট সম্মতি উন্নত করা। এ ছাড়া ২০২৯ সালের মধ্যে সামাজিক অবদানের ১ শতাংশ পয়েন্ট প্রথম থেকে দ্বিতীয় পেনশন স্তরে ফিরিয়ে দিতে এবং অবদানের হার বাড়িয়ে নির্ধারিত-অবদানভিত্তিক পেনশন স্তরগুলো শক্তিশালী করতে বলা হয়েছে।
সূত্র: আইএমএফ
আইএমএফ জানিয়েছে, লাটভিয়ার ব্যাংকগুলোর মূলধন ও তারল্য পর্যাপ্ত। সিআরআর৩ কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে বেশির ভাগ ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত উন্নত হয়েছে। মানিভ্যাল মূল্যায়নেও দেশটির অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কাঠামো জোরদার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
তবে ব্যাংকের ওপর আরোপিত ‘সংহতি অবদান’ পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালেই তুলে নিতে হবে। আইএমএফের ভাষ্য, এটি বহাল থাকলে ভবিষ্যতে ঋণ কম উৎপাদনশীল খাতের দিকে ঝুঁকতে পারে।
সংস্থাটি ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ, বিশেষ করে নিম্ন ঋণমানের গ্রাহকদের কাছে ঋণ বাড়তে থাকায় নিবিড় পর্যবেক্ষণের কথা বলেছে। ভোক্তা ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্সিং ও তদারকির দায়িত্ব ২০২৭ সালে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা কেন্দ্র (পিটিএসি) থেকে ব্যাংক অব লাটভিয়ায় হস্তান্তরের পরিকল্পনাকে সমর্থন জানিয়েছে আইএমএফ।
আইএমএফের মূল্যায়নে, লাটভিয়ার বাহ্যিক অবস্থান মৌলিক সূচক ও কাঙ্ক্ষিত নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ অবস্থার চেয়ে কিছুটা দুর্বল। চলতি হিসাবের ভারসাম্য ২০২৫ সালে ছিল জিডিপির ঋণাত্মক ৩ দশমিক ৪ শতাংশ; ২০২৬ সালে তা ঋণাত্মক ৪ শতাংশে নামতে পারে। বেকারত্বের হার ২০২৫ সালে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল, ২০২৬ সালে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে।
উৎপাদনশীলতা বাড়াতে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়ানো ও শ্রম চলাচল সহজ করার সংস্কারের কথা বলেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে আছে সক্রিয় শ্রমবাজার নীতি, অবসরের পরও কাজ করা পেনশনভোগীদের জন্য প্রণোদনা এবং অবসরের বয়স ভবিষ্যৎ প্রত্যাশিত আয়ুষ্কালের সঙ্গে যুক্ত করা। আঞ্চলিক পর্যায়ে ঋণ পেতে সরকারি-সমর্থিত বন্ধকি কর্মসূচিকে সমর্থন দিয়েছে আইএমএফ, তবে তা লক্ষ্যভিত্তিক থাকতে হবে।
ছোট ও দ্রুত বর্ধনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন সুবিধা বাড়াতে পুঁজিবাজার উন্নয়ন, ফিনটেক উদ্ভাবন ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে আর্থিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি কমাতে জোরালো তদারকিও রাখতে হবে। প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রণমূলক বোঝা কমানো এবং ইউরোপীয় একক বাজারে আরও একীভূত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ইউরোপীয় বিদ্যুৎ বাজারে একীভূতকরণ, গ্রিড সংযোগ সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। এতে জ্বালানির দামের অস্থিরতা কমবে এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হবে।