আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় বালখ প্রদেশের তরুণী শাবনাম (ছদ্মনাম) যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়তেন, তখন মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। এর পাঁচ বছর কেটে যাওয়ার পর তিনি বলছেন, পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে তাকে ‘জোর করে বিয়ে’ দেওয়া হয়েছে এবং তিনি ‘আত্মহত্যার চেষ্টা’ করেছেন।
আমু টিভিকে শাবনাম জানান, স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়াই তার জীবনের কঠিন সময়ের শুরু। একপর্যায়ে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়। স্কুল খোলা থাকলে এ বছর তার মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার কথা ছিল।
তিনি বললেন, ‘স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি। কারণ আমার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম। প্রতিদিন ঘুম থেকে চোখ খোলার পর ভাবি, আমি কী করব।’
শাবনাম জানান, পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট তার ওপর থাকা মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের জীবন নেওয়ার চেষ্টা করেন।
তার ভাষ্য, ‘আমার মা কাজ করতেন, কিন্তু তিনিও চাকরি হারান। আমাদের আর্থিক সংকটের কারণে আমাকে জোর করে বাগদান দেওয়া হয়। স্কুল বন্ধ এবং জোর করে বিয়ে দেওয়ার কারণে তৈরি মানসিক চাপ আমাকে আত্মহত্যার চেষ্টা করতে বাধ্য করে। আমি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা মেয়েরা কী করব?’

আফগানিস্তানে মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুলে যাওয়া বন্ধ হওয়ার পাঁচ বছর পূর্তির সময়ে তার এই অভিজ্ঞতার কথা সামনে এলো।
২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর মাধ্যমিক স্কুলগুলো খুলে দেওয়া হয়। তবে শুধু ছেলেদের শ্রেণিকক্ষে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। তালেবান কর্তৃপক্ষ প্রথমদিকে বলেছিল, মেয়েদের স্কুলে ফেরার জন্য পরিস্থিতি তৈরি করা হবে।
ছয় মাস পর, ২০২২ সালের ২৩ মার্চ নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে মেয়েরা স্কুলে আসে। কিন্তু তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়, ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের শিক্ষা-পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
আরেক শিক্ষার্থী সুমাইয়া আমু টিভিকে বলেছেন, আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া পাঁচ বছর কাটানোর ফলে তারা মানসিক চাপ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
তিনি বললেন, ‘আমরা ঘরে বসে গভীরভাবে দুঃখিত ও হতাশ। আমি শুধু আশা করি, তারা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবে এবং সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
ইউনিসেফ বলছে, ২০২১ সাল থেকে আফগানিস্তানে ২৬ লাখের বেশি মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, আফগানিস্তান এখনো বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের ও নারীদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা কার্যত বন্ধ।
ইউনিসেফের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক সঞ্জয় বিজেসেকেরা মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুল থেকে বাদ দেওয়ার পাঁচ বছর পূর্তিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে সব মেয়ের জন্য স্কুল খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এর প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউনিসেফ বলছে, স্কুলের বাইরে থাকা মেয়েরা শিশুশ্রম, অল্প বয়সে বিয়ে, নির্যাতন এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বেশি ঝুঁকিতে থাকে। দারিদ্র্য ও বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতিতে এসব ঝুঁকি আরও বাড়ে।
এপ্রিলে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়, মেয়েদের শিক্ষা ও নারীদের কর্মসংস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে আফগানিস্তানে প্রতিবছর প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের অর্থনৈতিক উৎপাদন হারাচ্ছে। এতে সতর্ক করে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে আফগানিস্তান ২০ হাজার নারী শিক্ষক এবং ৫ হাজার ৪০০ নারী স্বাস্থ্যকর্মী হারাতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বাসির আহমদ দানিশইয়ার বলেছেন, এসব নিষেধাজ্ঞা আফগান মেয়েদের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরির পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায়ও অবদান রেখেছে।
দানিশইয়ার আমু টিভিকে বলছিলেন, ‘আজ আমাদের দেশের মেয়েরা যে অনেক মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে এবং যে বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশ ছাড়ছে, অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের অনেকটাই এই বঞ্চনা ও নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সম্পর্কিত।’
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক রিচার্ড বেনেটও পাঁচ বছর পূর্তিতে মেয়েদের শিক্ষা থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন অন্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এটি ‘সম্ভবত মানবতাবিরোধী অপরাধ’। তার মতে, এই নিষেধাজ্ঞা মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি আফগানিস্তানের বর্তমান ও ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই পাঁচ বছরকে ‘অন্যায়ের পাঁচ বছর’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। মানবাধিকার সংগঠনটি বলেছে, লাখো আফগান মেয়ে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কিছু মেয়ে গোপন বা অনলাইন স্কুলের মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। অন্যরা শিক্ষার জন্য আফগানিস্তান ছেড়ে বিদেশে চলে গেছে।
তালেবান বারবার বলে আসছে, মেয়েদের শিক্ষার বিষয়টি এখনো বিবেচনাধীন। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইসলামী আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হলে স্কুলগুলো আবার খুলে দেওয়া হবে। মেয়েদের মাধ্যমিক শ্রেণিকক্ষ থেকে বাদ দেওয়ার পাঁচ বছর পরও তাদের ফিরে আসার কোনো সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
তবে শাবনামের মতো মেয়েদের জন্য এই পাঁচ বছরের পরিণতি শ্রেণিকক্ষের বাইরেও বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এফএএইচ