
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের খবরে আশার আলো দেখেছিলেন সরকারি চাকরিজীবীরা—মূল বেতন বাড়ছে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু সেই সুখবরের রেশ কাটতে না কাটতেই বাস্তবতা হতাশাজনক। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির আশ্বাস মিললেও কেটে গেছে প্রায় দুই সপ্তাহ, অথচ নতুন বেতন কাঠামোর খসড়াই এখনো ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, খসড়াটি এখনো পড়ে আছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। ফলে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ একগুচ্ছ ভাতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা কবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে এখনো অন্ধকারে লাখো সরকারি কর্মচারী।
তবে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির কাজ করছে অর্থ বিভাগ এবং শিগগিরই এটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বাড়ছে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন ও মোবাইল ভাতা। নতুন করে চালু হচ্ছে প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য ভাতা, পাশাপাশি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতাও। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন নিট পেনশন ১০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কমছে বাংলা নববর্ষের ভাতা।
সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় নতুন এই বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে, যাতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। মূল বেতন ও নিট পেনশন চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, আর বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
১. বাড়িভাড়া ভাতা বাড়ছে
ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ করা হচ্ছে। অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় গ্রেডভেদে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাতা মিলবে।
২. বয়সভেদে চিকিৎসাভাতা
বয়স বাড়ার সঙ্গে চিকিৎসাভাতাও বাড়বে। ৫০ বছর পর্যন্ত ৩ হাজার, ৫০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার, ৬০ থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সে ৬ হাজার টাকা চিকিৎসাভাতা দেওয়া হবে।
৩. নিম্ন গ্রেডে বেশি বেতন বৃদ্ধি
নতুন কাঠামোয় নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে—গ্রেড-৬ ও তার নিচে ৫ শতাংশ, গ্রেড-৪ ও ৩-এ সাড়ে ৩ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
৪. সবার জন্য মোবাইল ভাতা
নতুন কাঠামোয় সব গ্রেডের কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন—গ্রেড-৫ ও তার ঊর্ধ্বে ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-৬ ও তার নিচে ১৫০ টাকা।
৫. যাতায়াত ভাতা দ্বিগুণ
বর্তমান ৩০০ টাকার যাতায়াত ভাতা বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে। টিফিন ভাতা ২০০ থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়েছে।
৬. প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য ভাতা
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য নতুন করে মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা চালু হচ্ছে, যা সর্বোচ্চ দুই সন্তান পর্যন্ত পাওয়া যাবে।
৭. বাংলা নববর্ষের ভাতা কমছে
বর্তমানে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষ ভাতা দেওয়া হলেও তা কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
৮. ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতা বাড়ছে
প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা মূল বেতনের ১০ শতাংশ হারে নির্ধারণের পাশাপাশি ঝুঁকি ভাতা ও বিশেষ ভাতা ক্ষেত্রবিশেষে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা ও উৎসব ভাতা আগের হারেই বহাল থাকবে।
৯. পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার ভাতা
পাহাড়ি এলাকার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে ভাতা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পার্বত্য জেলা সদর ও সদর উপজেলায় এই ভাতার সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা এবং অন্যান্য পাহাড়ি এলাকায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। হাওর, দ্বীপ ও চর এলাকায় ২০ শতাংশ হারে ভাতা আগের মতোই থাকবে, তবে এর সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
১০. পেনশন ও গ্র্যাচুইটিতে পরিবর্তন
‘এক গ্রেড এক পেনশন’ পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নিট পেনশনের নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে—সর্বনিম্ন ১০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা।
১১. সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ভাতা বাড়ছে
সশস্ত্র বাহিনীর অফিসার ও সদস্যদের প্রতিরক্ষা ভাতা, কিট ভাতা, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ভাতা ও শিক্ষকতা ভাতাসহ বেশির ভাগ ভাতায় বিদ্যমান পরিমাণের ওপর ১০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।