প্রকাশ: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:২৩ পিএম (ভিজিট : ০)

সংগৃহীত ছবি
মার্কিন বিমানবাহিনীর এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের ওয়েপন সিস্টেমস অফিসার কর্নেল ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’ ইরানের মাটিতে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর প্রায় ৫০ ঘণ্টা গুরুতর আহত অবস্থায় একা আত্মগোপনে ছিলেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে তিনি সেই সময়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি জানান, প্যারাশুট ঠিকমতো না খোলায় প্রচণ্ড গতিতে মাটিতে আছড়ে পড়েন তিনি। এতে তার মেরুদণ্ড ও হাত ভেঙে যায়। কাঁধেও গুরুতর আঘাত লাগে। মাথা ও মুখ কেটে গিয়ে শুরু হয় রক্তক্ষরণ। এত গুরুতর আহত হওয়ার পরও মানসিক শক্তি ধরে রেখে পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলেন তিনি। পরে বিশেষ উদ্ধারকারী দলের সহায়তায় নিরাপদে ইরান থেকে ফিরে আসেন এই মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২ এপ্রিল ইরানের একটি কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মার্কিন বিমানবাহিনীর ‘এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল’ যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হয়। প্রায় ৩ কোটি ডলার মূল্যের দুই আসনের ওই যুদ্ধবিমানে ছিলেন পাইলট ‘আলফা’ এবং ওয়েপন সিস্টেমস অফিসার ‘ব্রাভো’, যিনি মার্কিন বাহিনীর একজন কর্নেল। বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর দুই কর্মকর্তাকেই প্যারাশুট নিয়ে ইরানের ভূখণ্ডে নামতে হয়।
বিমানে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে ব্রাভো বলেন, তার মনে হয়েছিল যেন একটি প্রচণ্ড গতির মালবাহী ট্রেন এসে বিমানে ধাক্কা দিয়েছে।খুব দ্রুতই পরিষ্কার হয়ে যায়, বিমানটিকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। ফলে দুজনকেই বিমান থেকে ইজেক্ট করতে হয়।
পাইলট ‘আলফা’ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার হন। কিন্তু ওয়েপন সিস্টেমস অফিসার ‘ব্রাভো’ দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পড়ে গুরুতর আহত হন। নিরাপত্তার কারণে তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
প্যারাশুট নিয়ে নিচে নামার সময় তিনি দেখতে পান, সেটি ঠিকমতো খুলছে না। সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে ব্রাভো বলেন, আমি উপরে তাকিয়ে দেখলাম প্যারাশুট খুলছে না। সেটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুহূর্ত।
তার ধারণা, প্যারাশুট ছাড়া ঘণ্টায় ৭০ থেকে ১০০ মাইল গতিতে প্রায় ৫ মাইল দূরে গিয়ে তিনি মাটিতে পড়েন।পাহাড়ি এলাকায় আছড়ে পড়ায় তার শিরদাঁড়া ও একটি হাত ভেঙে যায়। কাঁধেও গুরুতর চোট লাগে। মাথা ও মুখ কেটে গিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
এত গুরুতর আহত হওয়ার পরও ব্রাভো থেমে থাকেননি। তিনি বুঝতে পারেন, শত্রুপক্ষের এলাকায় একই জায়গায় অবস্থান করলে ইরানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সে সময় প্রায় ১ হাজার ৫০০ ইরানি সেনা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য তার সন্ধানে ওই ১০ মাইল এলাকার মধ্যে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন। এমনকি ইরানি টেলিভিশনে তার মাথার দামও ঘোষণা করা হয়েছিল।ব্রাভো বলেন, ইরানি টেলিভিশনে বন্দি হিসেবে নিজের মুখ দেখানোর ভয়েই আমি থামিনি।
সামনে ছিল পাহাড়ঘেরা একটি উপত্যকা। ভাঙা পিঠ ও হাত নিয়েই তিনি প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি এলাকায় উঠে যান। পরে পাহাড়ের একটি খাঁজে আশ্রয় নেন। তার কাছে খাবার বা পানি প্রায় কিছুই ছিল না। এর সঙ্গে ঠান্ডার কারণে শারীরিক যন্ত্রণাও আরও বেড়ে যায়।
অল্প অল্প করে বিশ্রাম নিয়ে তিনি বারবার অবস্থান পরিবর্তন করতেন, যাতে ইরানি বাহিনীর নজর এড়ানো যায়। একই সঙ্গে তিনি সংকেত পাঠানোর চেষ্টা চালিয়ে যান। প্রায় ২৪ ঘণ্টা মার্কিন বাহিনী তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানতে পারেনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে তখন তাকে উদ্ধারের জন্য বড় ধরনের অভিযান চালানোর পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায়।গত ৪৬ বছরে এই প্রথম ইরানের অভ্যন্তরে ঢুকে কোনো মার্কিন সেনাকে উদ্ধারের অভিযান পরিচালনা করা হয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে মাঝরাতে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, দুই সেনাকেই খুঁজে বের করে উদ্ধার করতে হবে।
অভিযানে শতাধিক সেনা, বিপুলসংখ্যক বিমান ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়। মার্কিন বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মাটিতে ৯০ জনের বেশি মার্কিন সেনা উদ্ধার অভিযানের অংশ হিসেবে মোতায়েন করা হয়েছিল। আকাশে ছিল শতাধিক যুদ্ধবিমান ও ড্রোন।
ব্রাভোর অবস্থান শনাক্ত করে তাকে উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। তার গতিবিধি শনাক্ত করতে গোপন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। একই সময়ে ইরানি বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে চালানো হয় ডিসেপশন ক্যাম্পেন। ব্রাভো যে এলাকায় লুকিয়ে ছিলেন, তার কাছাকাছি ইরানের আইআরজিসি বাহিনীর ওপর মার্কিন বিমানবাহিনী হামলাও চালায়।
এর পরই শুরু হয় চূড়ান্ত উদ্ধার অভিযান।
প্রায় ৫০ ঘণ্টা পর শেষ পর্যন্ত মার্কিন উদ্ধারকারী দল ব্রাভোর কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।উদ্ধারকারীদের কাছে পৌঁছানোর সেই মুহূর্তকে নিজের জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন ব্রাভো। বাড়ি ফেরার পর স্ত্রীকে ফোন করে নিজের বেঁচে থাকার খবর জানান তিনি।
ব্রাভোর মতে, ঘটনাটি শুধু তার ব্যক্তিগতভাবে বেঁচে ফেরার গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ, সহযোদ্ধাদের ওপর আস্থা, নেতৃত্ব এবং ‘কাউকে পিছনে না ফেলে আসার’ মার্কিন সামরিক প্রতিশ্রুতির উদাহরণ।
এত চোট ও তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি মানসিক শক্তি হারাননি। উদ্ধারকারী দল যখন তার কাছে পৌঁছায়, তখন ব্রাভো মুখ ফুটে শুধু একটি কথাই বলেছিলেন, চলো যাওয়া যাক।
মার্কিন সেনাবাহিনীর এই উদ্ধার অভিযান এবং ব্রাভোর বেঁচে ফেরাকে বিশেষজ্ঞরা একটি শব্দেই ব্যাখ্যা করছেন, ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক ঘটনা।