প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১:২৮ পিএম আপডেট: ২৭.০৮.২০২৬ ১:২৯ পিএম (ভিজিট : ১)

শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এক মামলায় বড় ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেটা। বুধবার করা এই সমঝোতায় মেটাকে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার দিতে হবে। একই সঙ্গে শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বেশ কিছু নতুন বিধিনিষেধ চালু করতে হবে।
সমঝোতাটি করেছে মেটা ও ৫২ জন অ্যাটর্নি জেনারেলের একটি জোট। আগামী ১০ বছর এসব শর্ত মেনে চলতে হবে মেটাকে। তবে প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের আইন ভঙ্গের কথা স্বীকার করেনি।
এই সমঝোতার আর্থিক অঙ্কটি বড় হলেও একবারে পুরো অর্থ দিতে হবে না। ১০ বছর ধরে অর্থ পরিশোধ করা হবে। ফলে মেটার ওপর তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ তুলনামূলক কম হবে। ২০২৫ সালে মেটার মোট আয় ছিল ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
তবে অর্থের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুদের জন্য মেটার প্ল্যাটফর্মে আসতে যাওয়া পরিবর্তনগুলো। সমঝোতার অংশ হিসেবে শিশু ও কিশোরদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নতুন ব্যবস্থা চালু করবে প্রতিষ্ঠানটি।
নতুন নিয়মে শিশুদের অ্যাপ ব্যবহারে দৈনিক দুই ঘণ্টার সীমা নির্ধারণ করা হবে। ব্যবহারকারীদের প্রতি ১৫ মিনিট পরপর বিরতি নিয়ে সচেতনভাবে অ্যাপ ব্যবহারের জন্য বার্তা দেখানো হবে।
মেটার হিসাবে কোনো অ্যাকাউন্ট অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীর বলে শনাক্ত হলে রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সেটি ডিফল্টভাবে বন্ধ থাকবে। স্কুল চলাকালীন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিজ্ঞপ্তিও বন্ধ রাখা হবে।
কিশোরদের পোস্টে কতটি লাইক পড়েছে, তা দেখার ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হবে। নিজের পোস্ট ও অন্যদের পোস্টের লাইক সংখ্যা ডিফল্টভাবে দেখা যাবে না।
তবে এসব নিয়ম কার্যকর করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বয়স যাচাই প্রযুক্তি। কারণ কোনো ব্যবহারকারী শিশু নাকি প্রাপ্তবয়স্ক সেটি সঠিকভাবে শনাক্ত করতে মেটাকে নতুন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে।
বর্তমানে বয়স যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে মুখমণ্ডলের ছবি যাচাই, সরকারি পরিচয়পত্র পরীক্ষা এবং ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ। প্রতিটি পদ্ধতিরই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আচরণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে কখনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে শনাক্ত করা হতে পারে। আবার শিশুকেও প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে শনাক্ত করার আশঙ্কা রয়েছে।
সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগবিষয়ক অধ্যাপক অ্যালেক্সিস ইংবার মনে করেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যেন ঝুঁকিতে না পড়ে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বয়স যাচাইয়ের বর্তমান প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়।
তবে সবাই বিষয়টিকে এতটা নেতিবাচকভাবে দেখছেন না। আইনজীবী ফিলিপ ইয়ানেলা মনে করেন, বয়স যাচাই প্রযুক্তি গত কয়েক বছরে অনেক উন্নত হয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ না করেও বয়স যাচাই করা সম্ভব হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে একজন ব্যবহারকারীর বয়সের তথ্য যাচাই করে একটি সংকেত তৈরি করা যেতে পারে। পরে সেই সংকেত ব্যবহার করে বোঝা যাবে ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট বয়সের নিচে কি না। এতে মূল ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ না করেও বয়স যাচাই করা সম্ভব হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, তথ্য সংরক্ষণ না করলেও সংবেদনশীল পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য অনলাইনে পাঠানোর সময় ঝুঁকি থেকেই যায়। বিশেষ করে শিশুদের পরিচয়পত্র বা মুখমণ্ডলের তথ্য ফাঁস হলে পরিচয় চুরির মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
মেটার এই সমঝোতা এমন এক সময়ে হলো যখন শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশে শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন ও নীতিমালা করা হচ্ছে।
এদিকে সমঝোতার পর মেটা নিজেদের শিশু নিরাপত্তা উদ্যোগকে সামনে আনছে। প্রতিষ্ঠানটি টিকটক ও ইউটিউবকেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
তবে সমঝোতার শর্ত বাস্তবায়নই এখন মেটার জন্য বড় পরীক্ষা। কারণ শিশুদের জন্য সময়সীমা, রাতের ব্যবহার বন্ধ কিংবা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে হলে প্রথমেই সঠিকভাবে বয়স শনাক্ত করতে হবে। ফলে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের এই সমঝোতার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু অর্থ নয়। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কতটা সুরক্ষিত রাখা যাবে সেটিই এখন বড় বিষয়।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই