নিবন্ধন খাতের ‘মাফিয়া মাইকেল’: ক্ষমতার পালাবদলেও অটুট প্রভাব

নিজস্ব প্রতিবেদক:

অপরাধ

সরকার বদলেছে, মন্ত্রী বদলেছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। কিন্তু নিবন্ধন পরিদপ্তরে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদায়ন ঘিরে মাইকেল

2026-08-10T13:24:13+06:00
2026-08-10T13:28:23+06:00
সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

নিবন্ধন খাতের ‘মাফিয়া মাইকেল’: ক্ষমতার পালাবদলেও অটুট প্রভাব
নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রকাশ: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ১:২৪ পিএম  আপডেট: ১০.০৮.২০২৬ ১:২৮ পিএম  (ভিজিট : ৬)

সরকার বদলেছে, মন্ত্রী বদলেছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। কিন্তু নিবন্ধন পরিদপ্তরে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদায়ন ঘিরে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর প্রভাব কমেনি—এমন অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআরএসএ) মহাসচিব হিসেবে তাঁর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা রয়েছে। বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও নিবন্ধন খাতে তাঁর প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিপুলসংখ্যক সাব-রেজিস্ট্রারের বদলিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মাইকেল মহিউদ্দিন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, বদলি-বাণিজ্য বা কোনো ধরনের সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডার থেকে সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পান মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ। এরপর ধীরে ধীরে নিবন্ধন খাতে তাঁর প্রভাব বাড়তে থাকে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি।

সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার সুবাদে নিবন্ধন খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে প্রভাব বিস্তার করার অভিযোগও রয়েছে। তবে আনিসুল হকের সঙ্গে কোনো ধরনের ঘনিষ্ঠতা বা যোগাযোগের কথা অস্বীকার করেছেন মাইকেল মহিউদ্দিন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাঁর প্রভাব অব্যাহত থাকার অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২৮৬ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বদলি প্রক্রিয়ায় তাঁর প্রভাব ছিল। এসব বদলির ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

নিবন্ধন কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার বিষয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নির্দেশের পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পদের হিসাব দিতে বলা হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, ওই নির্দেশনার পর গত বছরের ২৭ আগস্ট সচিবালয়ে নিবন্ধন কর্মকর্তাদের একটি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভের নেপথ্যে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, রাজধানীর অভিজাত এলাকার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় নিবন্ধন কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে তদবির ও আলোচনা হতো। বিআরএসএর কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বদলি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো যেসব বদলির তথ্য দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

গোলাম মোস্তফা:
বিআরএসএর যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা চুয়াডাঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বদলি হন বলে জানা গেছে।

জাহাঙ্গীর আলম:
যুগ্ম মহাসচিব জাহাঙ্গীর আলম শেরপুর থেকে কয়েক মাসের মধ্যেই ঢাকার বাড্ডায় পদায়ন পান বলে সূত্রের দাবি। এই পদায়নকে ঘিরে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

মামুন বাবর মিরোজ: সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন বাবর মিরোজ মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে বদলি হন বলে জানা গেছে।

আব্দুল বাতেন: সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল বাতেন নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবাবগঞ্জ থেকে গাজীপুর সদরে পদায়ন পান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সিন্ডিকেটের কথিত আর্থিক লেনদেনের সমন্বয়ে আব্দুল বাতেনের ভূমিকা ছিল বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিপুল সম্পদের অভিযোগ

মাইকেল মহিউদ্দিন ও তাঁর স্বজনদের নামে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল সম্পদ থাকার অভিযোগ উঠেছে। দুদকে দাখিল করা অভিযোগে এসব সম্পদের একটি তালিকাও দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আফতাব নগরে তাঁর মালিকানাধীন একটি ভবনে অন্তত ২৯টি ফ্ল্যাট রয়েছে। গুলশান-১-এর ৭ নম্বর রোডের কোহিনুর টাওয়ারে দুটি ফ্লোর, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি বাড়ি এবং গুলশান এলাকায় একাধিক প্লট রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া গুলশান-১-এর ‘শখিনা’ ভবনে ২ হাজার ৫০০ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট, পূর্বাচল মডেল টাউনে শ্যালকের নামে একটি প্লট, গুলশান-১-এর ৩৩ নম্বর রোডে দুটি ফ্ল্যাট, নর্থ এভিনিউ গুলশানে নির্মাণাধীন তিনটি ফ্ল্যাট এবং লেক সার্কেল এলাকায় একটি ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তাঁর স্ত্রী জান্নাত নীলার নামে প্লট ও নিকেতনে একটি ফ্ল্যাট এবং হাতিরঝিল এলাকায় শ্যালকের নামে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে।

রাজধানীর বাইরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাদেকপুরে ইটভাটা, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একাধিক প্লট, মগবাজার ও কাঁঠালবাগানে ফ্ল্যাট ও ফ্লোর এবং বনশ্রীতে স্বজনদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও করা হয়েছে।

নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে প্রায় ১০০ বিঘা কৃষিজমি, মাছের ঘের ও ইটভাটা থাকার অভিযোগও রয়েছে। তাঁর বোন আসমাউল হুসনা লিজার বিসিএস ক্যাডারে নিয়োগ ও পরবর্তী পদায়নে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে বলে দুদকে দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব সম্পদের মালিকানা, মূল্য ও অর্থের উৎস সম্পর্কে সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন।
দুদকে অভিযোগ, তদন্তের দাবি

গত ১৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাফসান আল আলভী মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে ‘শত কোটি টাকার বদলি-বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের’ অভিযোগ তুলে দুদকে তদন্তের আবেদন করেন।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগটি প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি বা অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো মামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান আইনমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর নিবন্ধন খাতে বড় ধরনের নতুন বদলি বা পদোন্নতি হয়নি। আগের সময়ের অনিয়মের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে অভ্যন্তরীণভাবে কাজ চলছে। বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।

তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, তাঁর নামে কোনো বাড়ি, গাড়ি বা উল্লেখযোগ্য সম্পদ নেই। তিনি ভাড়া বাড়িতে থাকেন এবং ভাড়া গাড়িতে চলাফেরা করেন।

সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের সম্পর্ক বা যোগাযোগ ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁকে আনিসুল হকের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেছেন মাইকেল মহিউদ্দিন। বদলি-বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন কিংবা কোনো সিন্ডিকেট পরিচালনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগও তিনি নাকচ করেছেন।


ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ