তিন ভাই-বোনের মধ্যে রাকিব (ছদ্মনাম) সবার ছোট। স্কুলজীবনে মেধাবী, ভদ্র ও সম্ভাবনাময় এই তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর নতুন বন্ধু, নতুন পরিবেশ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত কয়েকজনের হাত ধরে প্রথম মাদকের সংস্পর্শে আসে। শুরুটা অবশ্য কৌতূহল থেকে। ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গোপন গ্রুপ, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ এবং অনলাইন লেনদেনের মাধ্যমে নিয়মিত মাদক সংগ্রহ করতে থাকে। পরিবারের কেউ বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই তার লেখাপড়া থেমে যায় এবং একসময় তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হয়। রাকিবের গল্প শুধু একজন তরুণের নয়; এটি ডিজিটাল যুগে মাদকের বিস্তৃত জালের একটি প্রতিচ্ছবি।
একসময় মাদক ব্যবসা বলতে সীমান্তপথে চোরাচালান কিংবা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় গোপন কেনাবেচার চিত্রই বেশি চোখে পড়ত। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল অ্যাপ, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা এমনকি ভার্চুয়াল সম্পদ ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমেও মাদক ব্যবসা পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই নতুন বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করেছে, যার লক্ষ্য প্রযুক্তিনির্ভর মাদক অপরাধ দমনে আইনি সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা।
মাদক শুধু একজন মানুষের শরীরের ক্ষতি করে না; এটি একটি পরিবারকে ভেঙে দিতে পারে, সমাজে অপরাধ বাড়াতে পারে এবং একটি দেশের মানবসম্পদকে দুর্বল করে দিতে পারে। মাদকাসক্ত একজন ব্যক্তি ধীরে ধীরে পরিবার, শিক্ষা, কর্মজীবন এবং সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা কিংবা অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটে। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি সামাজিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং জাতীয় উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড়ো শক্তি। এই শক্তিকে যদি মাদকের মতো ভয়াবহ আসক্তি গ্রাস করে, তাহলে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ডিজিটাল যুগে মাদক ব্যবসার ধরনও পাল্টে গেছে। অপরাধীরা ভুয়া পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করে, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে ক্রেতার সঙ্গে লেনদেন সম্পন্ন করে এবং ডিজিটাল পেমেন্ট বা অন্যান্য ভার্চুয়াল ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ গ্রহণের চেষ্টা করে। অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতিতে মাদক উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ পুরো যোগাযোগ ও লেনদেন ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্যও নতুন ধরনের সক্ষমতা প্রয়োজন।
এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সংশোধিত আইনে ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত মাদক-সংক্রান্ত অপরাধকে স্পষ্টভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাইবার স্পেস, ডিজিটাল ডিভাইস, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ, প্রচার, যোগাযোগ কিংবা সহযোগিতা করেন, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার কিংবা ব্যবহারের চেষ্টার মাধ্যমেও যদি মাদক ব্যবসা পরিচালিত হয়, সেটিও আইনের আওতায় আসবে। আইনটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে—ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে বিচার করতে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক নয়; ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতেও বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনা করা যাবে।
সংশোধিত আইনে এসব অপরাধের জন্য যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আবার আন্তর্জাতিক বা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অংশ হিসেবে অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা বা কারাদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আদালত বা মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল অপরাধে ব্যবহৃত ডিজিটাল ডিভাইস, অ্যাকাউন্ট, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ বা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা পেয়েছে।
আইন সংশোধনের পাশাপাশি মাদক প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। মাদকপ্রবণ এলাকায় স্বতন্ত্র মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান পুনর্বহাল করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে ডগ স্কোয়াড গঠন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ মাদকবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা আরও বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা যায়।
তবে কেবল কঠোর আইন করলেই মাদক সমস্যা সম্পূর্ণ দূর হবে না। আইন অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কিন্তু আসক্তি প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা, পারিবারিক বন্ধন, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততা। পরিবারে সন্তানের প্রতি সময় দেওয়া, তাদের বন্ধু ও অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ রাখা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করা মাদক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মাদকের ভয়াবহতা, আইনের বিধান, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করলে অনেক তরুণ বিপথে যাওয়ার আগেই সতর্ক হতে পারে। পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি নাগরিককে সন্দেহজনক মাদক কার্যক্রম সম্পর্কে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের একটি বড়ো অংশ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনেরও প্রয়োজন অনুভব করেন। যারা অপরাধচক্র পরিচালনা করে এবং যারা আসক্তির শিকার—এই দুই বিষয়কে যথাযথভাবে বিবেচনা করে আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সুস্থ জীবনে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি করাও একটি মানবিক দায়িত্ব।
মাদকের বিস্তার রোধে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতাই যথেষ্ট নয়; এ ক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সন্তানের আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন সম্পর্কে সতর্ক থাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং ও মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তোলা মাদক প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা তাদের বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
মাদক প্রতিরোধে তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে বর্তমান সরকার। ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের শারীরিক ও মানসিক শক্তিকে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে পারলে তারা মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে দূরে থাকবে বলে ধরে মনে করা হয়। এ লক্ষ্যেই সরকার ‘নতুন কুঁড়ি’ স্পোর্টস ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, যা তরুণদের সুস্থ বিকাশ ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি যেমন অপরাধীদের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি একই প্রযুক্তি অপরাধ দমনেরও শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ, আর্থিক লেনদেনের নজরদারি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ মাদক চক্র শনাক্ত করা আরও সহজ হতে পারে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয় আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে।
মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই তখনই সম্ভব হবে, যখন কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজে সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চা আরও শক্তিশালী হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই হতে পারে একটি মাদকমুক্ত, সুস্থ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার সবচেয়ে বড়ো শক্তি।
লেখক : সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর। পিআইডি ফিচার
ডেল্টা টাইমস/মো. খালিদ হাসান/সিআর/এমই