বাংলাদেশ সরকারের যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ খাত রয়েছে তার মধ্যে স্বাস্থ্যখাত অন্যতম। প্রতি বছর বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হয়।বাজেটের বরাদ্দ অংশের সিংহভাগই ব্যয় করা হয় সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাতে।
আমরা জানি, মানুষের ৫ টি মৌলিক চাহিদার মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। দেশের মানুষের এই গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরনের জন্য সরকার সরকারি হাসপাতালে ও ক্লিনিক ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করেছে যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণকে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এবং তাদের মৌলিক অধিকার অক্ষুন্ন রাখা।কিন্তু বাস্তবে আমরা যা দেখি তা খুবই হতাশাজনক।
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মোট হাসপাতালের সংখ্যা ৩,৫৭৫ টি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতাল ৫৯২টি। টি।আবার সরকারি হাসপাতালের মধ্যে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ৪৬৭ টি এবং১২৫ টি বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে।

অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে হাসপাতালে বেডের সংখ্যা রয়েছে ৯২,৮০৪ টি।ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার মান খুবই নাজুক। যারা একদম ছোট থেকেই জীবনের লক্ষ্য লিখতেন, বড় হয়ে ডাক্তার হয়ে বিনামূল্যে গরীব মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিবেন তারাই যখন এই মহান দায়িত্বে নিজেকে আত্ননিয়োগ করেন তখন যেন শিশুকালের সেই জীবনের লক্ষ্যকে ভূলে যান।
এমন ডাক্তার খুবই কম পাওয়া যাবে যারা একদম ঠিক সময়ে হাসপাতালে রোগী দেখতে আসেন৷ সেজন্যে রোগীদের ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন ধরে দাড়িয়ে থাকতে হয়।এই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা যে কি পরিমাণের বিরক্তের বিষয় ভূক্তভোগী ছাড়া বুঝা কষ্টকর। আবার বেশিরভাগ ডাক্তার যারা খুব সময় নিয়ে রোগী দেখেন। তাড়াতাড়ি করে কোন রকম রোগী দেখে ৩/৪ পাতা ট্যাবলেট ধরিয়ে দিলেই যেন তারা বেচে যান।এমনকি অনেক সময় সরকারিভাবে দেওয়া ২/৪ পাতা ঔষধের বিকল্প ঔষধ ও প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন। এটা বলার প্রয়োজন মনে করেন না যে, ঔষধ ২টা একটা অন্যটার বিকল্প।
এখন খুবই চিন্তার বিষয় হচ্ছে, যারা সচেতন ও শিক্ষিত তারা হয়তো বুঝবে এবং ঔ বিকল্প ঔষধগুলো একটা শেষ হবার পর অন্যটা খাওয়া শুরু করবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বিষয়টা কয়জন সাধারণ মানুষ ভালোভাবে বুঝবে?
অবশ্য বুঝার কথাও না। কারণ সরকারি হাসপাতালে সাধারণত ঐ শ্রেণির মানুষই বেশি যায় যাদের বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য নেই।তবে অনেকে সরকারি হাসপাতালে যায় বেসরকারি হাসপাতালে যোগ্য ডাক্তারের অভাব বলে।ধনী,মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা সরকারি হাসপাতালে খুব কমই যায়। বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা খুবই পরিপাটি এবং চিকিৎসা সেবার মান ও ভালো। যার কারণে এসব হাসপাতালে রোগী যাওয়ার প্রবণতা বেশি যদিও চিকিৎসা সেবা অনেক ব্যয়বহুল। নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য নেই বলে সরকারি হাসপাতালে শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে যায়।
লক্ষনীয় যে, অনেক সরকারি হাসপাতাল আছে যেগুলোতে অত্যাধুনিক চিকিৎসার সরঞ্জাম নেই। আবার যা আছে তা অনেক পুরনো এমনকি ঠিকমতো কাজ ও করে না। অন্যদিকে অনেক সরকারি হাসপাতালের ভিতরের পরিবেশ খুবই নাজুক।পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বড়ই অভাব।বিশেষ করে ওয়াশরুম গুলোতে যদি কোন সুস্থ মানুষ যায় তাহলে সে নিজেই অসুস্থ হয়ে যাবে দূর্গন্ধের কারণে।
ডাক্তাররা মানুষের সেবা করার দৃঢ় সংকল্প নিয়েই যেহেতু এই মহান পেশাকে বেছে নিলেন তখন কর্মক্ষেত্রে তাদের অবহেলা একজন সচেতন নাগরিককে ভাবিয়ে তুলে!
এসব ডাক্তারদের সরকার অবশ্যই বেতন ও সর্বোচ্চ সুযোগ দিয়ে রেখেছে অথচ কর্মক্ষেত্রে তাদের নেই আন্তরিকতার ছিটাফুটা।যে ডাক্তারকে সরকারি হাসপাতালে দেখা যায় দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলা করছেন ঠিক একই ব্যক্তিকে নিজস্ব চেম্বারে বা অন্য বেসরকারি হাসপাতালে অনেক দায়িত্বশীল ও আন্তরিক দেখা যায়, শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি এবং বাস্তব।
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে ভর্তিকৃত দুই- তৃতীয়াংশ রোগী ভর্তি হলেই চিকিৎসকের দেখা পায় না, চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হয়।আবার, ২৫ শতাংশ রোগীর অভিযোগ, চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রের বিষয় রোগীদের ভালো ভাবে বুঝিয়ে বলেন না।আবার অর্ধেক রোগী চিকিৎসককে কোনো প্রশ্ন করেন না।তাছাড়া জরুরি সেবার কক্ষের মান ও সন্তুষজনক নয়। অন্যদিকে চিকিৎসা কেন্দের গোপনীয়তার ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত নয়।
অনেক সময় দেখা যায় দরিদ্র মানুষ সঠিক চিকিৎসা হাসপাতালে গিয়ে পায় না।ফলস্রুতিতে তারা বাইরের ঔষধের দোকান থেকে চিকিৎসা নেন।এর আশু পরিবর্তন দরকার। অসংক্রামক রোগে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয় ও ঔষধ খেতে হয়। এতে দরিদ্র আরও দরিদ্র হয়ে যায়।১৬২৬৩ নাম্বারে কল করলে কোনো ডাক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যায় বা এম্বুলেন্স সেবায় হেরফের হলেও অভিযোগ করা যায়। তবে আফসোস আমরা অনেকে সেটা জানিই না অভিযোগ এর বিষয় তো অনেক দূর।
হুম আমি আপনাদের বলছি যারা ডাক্তারীর মত মহান পেশায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।সময় এসেছে নিজেদের পরিবর্তন করুন।আপনাদের যথাযথ কর্তব্য পালনের জন্য যেমন একটি মানুষের মূল্যবান জীবন রক্ষা হয় ঠিক তেমনি সামান্য অবহেলার কারণে ঝরে পরে অনেক মানুষের জীবন। কার্যক্ষেত্র আন্তরিক হোন সেটাই আমাদের কাম্য - আপনাদের কাছে একটা মানবিক আবেদন রইলো। (প্রকাশিত
লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, ডেল্টা
টাইমস্ কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার ডেল্টা
টাইমস্ কর্তৃপক্ষ নেবে না। )
সানজিদা ইয়াসমিন লিজা
আইন বিভাগ, ২য় বর্ষ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
ডেল্টা টাইমস্/সানজিদা ইয়াসমিন লিজা/সিআর/জেড এইচ