
পদ্মা ব্যারাজে বদলে যাওয়া অঞ্চল। ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি
বর্তমান সরকারের মাস্টার প্রকল্প পদ্মা ব্যারাজ জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাস্তবায়িত হলে পরিকল্পিতভাবে পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।এতে একদিকে যেমন শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দূর হবে, আবার অন্যদিকে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও নদী ভাঙন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একইভাবে পানি ও মাটি থেকে অতিরিক্ত লবণাক্ততা কমিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রাখবে। তাই এটি বাংলাদেশের পানি, কৃষি, অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য অবশম্ভাবী একটি প্রকল্প।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
আর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দাবি, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নে বছরে মাছের উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন বৃদ্ধিসহ সব মিলিয়ে বছরে ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে।
এক সময় প্রাণবন্ত ছিল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলো। ১৯৭০-এর দশকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি সরিয়ে নেয়ার কারণে বাংলাদেশে পদ্মা নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল মরুকরণ হয় শুষ্ক মৌসুমে। এখন মৃতপ্রায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী।
নদীগুলোতে পলি মাটির স্তর পড়েও লবণাক্ততার সৃষ্টি হয়। আবার বর্ষাকালে পানি বাড়লে সেই পানি ধারণের অবস্থাও থাকে না। তখন বন্যার কবলে পড়ে এসব অঞ্চলের জনপদ।
পরিবেশের এ বিরূপ আচরণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, আবহাওয়া, জলবায়ু, পরিবেশ অর্থনীতি, সেচ, কৃষি, মাছ উৎপাদন ও নৌ চলাচল দারুণভাবে ব্যাহত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জীববৈচিত্র্য। এর প্রভাবে দেশের কয়েক কোটি মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েন।
পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক এ সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী-খালগুলোতে লবণাক্ততার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলের মানুষ খাওয়ার পানি পর্যন্ত পায় না শুষ্ক মৌসুমে। কৃষি জমিতে কৃষকরা সেচের পানি না পেয়ে মেশিন দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে জমিতে দেয়। এতে পানির স্তুর নিচে নেমে যাচ্ছে, বাড়ছে আর্সনিক।
এছাড়া মৃতপ্রায় নদীতে মাছের উৎপাদন কমছে শুষ্ক মৌসুমে। বেকার হয়ে পড়েছেন অনেক জেলে। পানি না থাকায় নদীভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যহত হচ্ছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্রের ওপরও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এরই মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার (পদ্মা) পানি বণ্টন চুক্তরে মেয়াদও আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে।
এ পরিস্থিতিতে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান সরকারের প্রথম মেগা প্রকল্প পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সর্বশেষ আপডেট জানিয়ে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে কাজ অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। পানি ভবনে পদ্মা ব্যারাজ সংশ্লিষ্ট একটি অফিস আলাদা করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর পাংশার হাবাসপুরে প্রকল্পের সাইট পরিদর্শন করেছি আমরা। গত ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া কাঞ্চনপার্ক এলাকায় প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছি। ব্যারাজের কাজের অগ্রগতি আরও গতিশীল হচ্ছে। সব ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা ব্যারাজের দৃশ্যমান কাজের উদ্বোধন করবেন।
পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের সুবিধার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দেশের চার বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন। কৃষি ও অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, পানিতে লবণাক্ততার কারণে আগামী ২৫ থেকে ৩০ বছর পর ওই অঞ্চলে মানুষ আর বসবাস করতে পারবে না। সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। মাছসহ অন্য প্রাণী ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কিন্তু পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ স্বর্ণযুগে প্রবেশ করবে। কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক কমটির সভায় পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি বাস্তবায়নে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রকল্পের পুরো অর্থায়ন হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। তবে দ্বিতীয় ধাপে ব্যয় আরও বাড়বে। ব্যারাজটি চলতি বছরের জুলাই মাসে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প বিএনপি সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতি রক্ষায় এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিসঙ্কট দূর করতে এ ব্যারাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। মূলত বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিত পানি সরবরাহের জন্য বাঁধটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় মূল অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এর সঙ্গে থাকবে ৭৮টি পানিনিষ্কাশন কপাট (স্পিলওয়ে), ১৮টি তলদেশ নির্গমন পথ (আন্ডারস্লুইস), দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ।
ব্যারাজটিতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেইসঙ্গে থাকবে ১১৩ মেগাওয়াট জল বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪১ কিলোমিটার। প্রতিবছর বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনের কারণে গত দুই দশকে পদ্মা নদী বিধৌত বিভিন্ন এলাকায় আনুমানিক ৮ থেকে ১০ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। পদ্মা নদীর তীরবর্তী জেলাগুলোতে প্রতিবছর গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার পরিবার প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙনের ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের আওতায় নদীর নাব্যতা রক্ষায় নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম, তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ ও নদীর প্রবাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে নদীভাঙনের হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বেশি লবণাক্ততার কারণে খাওয়ার পানির সংকট রয়েছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ পানির সংকটের পাশাপাশি সুন্দরবন ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা আরও বাড়বে। এছাড়া বাড়বে পলি জমার কারণে জলাবদ্ধতা। এ জন্য আমাদের প্রয়োজন হবে ওই অঞ্চলগুলোতে ফ্রেশ পানির সর্বচ্চ সরবরাহ ও প্রবাহ। এ ক্ষেত্রে পদ্মা ব্যারাজ বড় ভূমিকা রাখবে।
মাশফিকুস সালেহীন বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হবে, পানি ও মাটিতে থাকা লবণাক্ততা হ্রাস পাবে। নিঃসন্দেহে প্রকল্পটি ওই অঞ্চলের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করবে, তবে নির্মাণের ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি জমা, নদীভাঙন, উজানে নদী ক্ষয় ও পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সরকার নিশ্চয় সেগুলো বিবেচনা করেই এগোচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যারেজের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী ও পদ্মা ব্যারাজ-দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, পদ্মা ব্যারাজ জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফারাক্কা বাঁধের কারণে আমাদের এক তৃতীয়াংশ ভূমি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এছাড়া নৌ-চলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কৃষি, অর্থনীতি ও প্রানীজ সম্পদসহ নানাভাবে মানুষ ক্ষতির মুখে পড়ছে। এসব থেকে মুক্তি পেতে পদ্মা ব্যারাজের বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ প্রথমে নেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। এরপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৪ সালের দিকে পুনরায় উদ্যোগ নেন। কিন্তু সেটি তখন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরে বিষয়টি আমরা সামনে এনেছি, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নে আন্দোলন করেছি।
সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, সে অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। আশা করছি অদূর ভবিষ্যতে পদ্মা ব্যারাজ দৃশ্যমান হবে। জাতি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সার্বিকভাবে উপকৃত হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে।
চলমান গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্প ও প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেচ সুবিধা বাড়ানো হবে।
খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা, ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ, রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলায় প্রকল্পটি প্রথমে বাস্তবায়িত হবে।
হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীসহ প্রধান নদী ব্যবস্থার প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার এছাড়াও প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা কমানো।
এছাড়া সুন্দরবনের জন্য মিঠাপানির সরবরাহ নিশ্চিত করা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, যশোরের ভবদহসহ জলাবদ্ধতা নিরসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভূ-গর্ভস্থ জল পুনঃসঞ্চয়ন ও আর্সেনিক দূষণ কমানোও এই প্রকল্পের লক্ষ্য।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই