
জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং পুলিশ ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা চিরতরে বন্ধ করতে চান বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শুনেছে কমিটি। এসব অপরাধ প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির দশম বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুরও উপস্থিত ছিলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৭ বছরে গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি, এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং গুমের শিকার হয়ে ফিরে আসা ব্যক্তিদের প্রতিনিধিদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। প্রতিনিধি হিসেবে ৪৮ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁদের তালিকা তৈরিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি সংগঠন সহযোগিতা করেছে।
বৈঠকে গুমের শিকার সানজিদা ইসলামের ছোট ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমন, গুমের শিকার হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সংসদ সদস্য আনিছুর রহমানসহ নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তিনি। তাঁদের কেউ স্ত্রী, কেউ সন্তান, কেউবা বাবা হিসেবে স্বজনের সন্ধান ও বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের আবেগ, অনুভূতি ও বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন কমিটির সদস্যরা। তিনি নিজেও গুমের শিকার হয়েছিলেন উল্লেখ করে বলেন, তাঁদের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা তিনি বুঝতে পারেন।
গুম বন্ধ ও বিচারের দাবি
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। ভবিষ্যতে যেন কেউ গুমের শিকার না হন, নিখোঁজ ব্যক্তিরা যেন ফিরে আসেন এবং যারা ফিরে এসেছেন বা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের ঘটনায় দায়ের করা মামলার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হয়—এমন দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা এখনো তাঁদের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। এসব পরিবারের সময়সীমা, সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং পরিবারের সদস্যদের সহায়তার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে থাকা বিধান নিয়েও তাঁরা মতামত দিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় আবেদন জানিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই, বাংলাদেশে গুমের অপসংস্কৃতি ও অপরাধ চিরতরে বন্ধ হোক। আমরা চাই, বাংলাদেশে কোনো দিন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হবে না, গুমের শিকার কেউ হবেন না, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার কেউ হবেন না। কাস্টডিয়াল ডেথ অর্থাৎ পুলিশি হেফাজতে বা কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও বন্ধ হবে।’
তিনি আরও বলেন, এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশায় শিক্ষার্থী ও তরুণেরা আন্দোলনে রক্ত দিয়েছেন। তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। সংবিধানে ধারণ করা প্রয়োজন, এমন বিষয় সংবিধানে রাখা হবে। আর যেসব বিষয় আইন বা বিধি-বিধানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলো সেভাবেই করা হবে।
সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ ও নতুন আইন
সংবিধানে জীবন অধিকারের বিধান নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন অধিকারের বিষয়টি রয়েছে এবং এটি যথেষ্ট। এর আলোকে আইন প্রণয়ন করে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও আইন প্রণয়ন করা হতে পারে। সংবিধানে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সংসদে পাস হওয়া আইনে দুইভাবে ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে। প্রথমত, দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তি আদালতের নির্দেশে রাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করতে পারে। সেই সম্পত্তি বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব। দ্বিতীয়ত, কোনো কারণে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে।
গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার বিষয়েও আইনে বিধান রয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, যে বাহিনী বা বাহিনীর যে শাখার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবে, তারা নিজেরা সেই অভিযোগের তদন্ত করবে না; অন্য বাহিনী তদন্ত করবে।
আইনে জবাবদিহি ও ভারসাম্যের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভাগীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং ফৌজদারি অপরাধ আলাদা বিষয়। কেউ ফৌজদারি অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান
সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিরোধী দলের আন্দোলনের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নানা ধরনের মন্তব্য ও দাবি আসছে। তাঁরা সড়কে আন্দোলন না করে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির কাছে এলে কমিটি তাঁদের বক্তব্য শুনতে পারত।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের অনেকেই গুমের শিকার হয়েছেন। তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি নিজেও গুমের শিকার হয়েছিলেন। এ ছাড়া ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের মা, বোন, বাবা ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যাঁরা সংসদ সদস্য হয়েছেন, তাঁদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে বুধবারের বৈঠকটি মূলত গত ১৭ বছরে গুমের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে ছিল।
সংবিধান সংশোধনে বিভিন্ন প্রস্তাব
সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত অনেক পরামর্শ ও প্রস্তাব পাওয়া গেছে বলে জানান কমিটির সভাপতি। সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট ও আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি, শিক্ষক সমাজ এবং সম্পাদকমণ্ডলীর কাছ থেকে এসব প্রস্তাব এসেছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পাওয়া প্রস্তাবগুলো একত্র করে কমিটিতে পর্যালোচনা করা হবে। এ প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
জুলাই সনদে থাকা তিনটি ভাষার বিষয় এবং র্যাঙ্কড চয়েস ভোটের প্রস্তাব নিয়েও কথা বলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো বিষয়ে সমতা না হলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রস্তাব বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। র্যাঙ্কড চয়েস ভোটের বিধান নিয়ে সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে তাঁদের অবস্থান। আলোচনার মাধ্যমে জাতীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য অন্য প্রস্তাবও আসতে পারে। তাই সব বিষয় পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এটি প্রবর্তন করতে হবে, এ নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। তবে কী প্রক্রিয়ায় সরকার গঠন হবে, কত দিনের মধ্যে গঠন করতে হবে এবং কোন সার্চ বডি বা নির্বাচনপ্রক্রিয়া অনুসরণ করলে বিতর্ক এড়ানো যাবে—এসব বিষয় পরীক্ষা করে দেখা হবে।
কমিটির প্রতিবেদন প্রণয়নের পর বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হবে বলে জানান তিনি। সংসদে বিতর্কের সময়ও এ বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ ও প্রস্তাব আসতে পারে।
ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য
সরকার চাইলে ক্রসফায়ার করা হবে—এমন বক্তব্য দেওয়ার পরও আইজিপি পদে থাকার অধিকার আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের আট মাসের মেয়াদে কোনো ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হেফাজতে মৃত্যু বা গুমের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা বিবেচনায় নিতে হবে। এ ধরনের কোনো অভিযোগ এলে তা তদন্ত করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে তদন্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকার এ ধরনের ঘটনায় জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোকেও আহ্বান জানানো হয়েছে।
আইজিপির বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি হয়তো অসতর্কভাবে শব্দচয়ন করেছেন। আইজিপি কোথাও বলেননি যে ক্রসফায়ার করার নির্দেশনা সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন বা নিজে তা করতে চান। তবে এ ধরনের শব্দচয়ন বা উচ্চারণ সঠিক হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।