বৈশ্বিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হয়ে উঠছে উপসাগরীয় অঞ্চল। এ প্রেক্ষাপটে আগামীকাল রোববার কাতারের রাজধানী দোহায় শুরু হচ্ছে নবম বিশ্ব বিনিয়োগ ফোরাম (ডব্লিউআইএফ) ২০২৬। তিন দিনের এ আয়োজন চলবে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত।
‘ভবিষ্যতে বিনিয়োগ’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ ফোরামে একত্র হবেন নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী নেতা ও উন্নয়ন সহযোগীরা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্যে বিনিয়োগকে কীভাবে টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার হাতিয়ার করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে।
ফোরাম শুরুর আগের দিন গতকাল শুক্রবার জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাড (ইউএনসিটিএডি) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, এশিয়ার উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে আফ্রিকা, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারের সংযোগ তৈরিতে উপসাগরীয় অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অঞ্চলটির বিনিয়োগকারীরা ক্রমেই আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের কার্যক্রম বাড়াচ্ছেন।
রেকর্ড ছুঁয়েছে এফডিআইআঙ্কটাডের উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) বিনিয়োগ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জিসিসিভুক্ত ছয় দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহ প্রায় ৯৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা রেকর্ড। দেশগুলো হলো বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
একই বছরে এসব দেশের বিদেশে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ১১ শতাংশ বেড়ে ১৩০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর বাইরে ঘোষিত নতুন প্রকল্পে গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ ২০১৬–২০২০ সময়ের তুলনায় ২০২১–২০২৫ সময়ে তিন গুণের বেশি বেড়ে ৪৬১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। নতুন স্থাপনা, কারখানা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে বিনিয়োগকে গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ বলা হয়।
বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্রজ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে উপসাগরীয় দেশগুলো। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সরবরাহ ও পরিবহন অবকাঠামো, উন্নত উৎপাদনশিল্প, ডিজিটাল অবকাঠামো, পর্যটন ও আর্থিক সেবার মতো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ছে।
এর মধ্যে টেলিযোগাযোগসহ ডিজিটাল অবকাঠামো বিনিয়োগের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে এ খাতে জোর দিচ্ছে দেশগুলো।
আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন উন্নয়নশীল অর্থনীতিতেও উপসাগরীয় বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা বাড়ছে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও জ্বালানির রূপান্তরের মতো খাতে তাদের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ এসব খাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়নের ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
অনিশ্চয়তার ঝুঁকিআঙ্কটাডের প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বিঘ্ন এবং ২০২৬ সালের শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কার্যক্রমে দুর্বলতার লক্ষণকে বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করতে অবকাঠামোগত সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং স্থানীয় সরবরাহকারীদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিন দিনের এ ফোরামে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের নীতি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। বৈশ্বিক বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে অঞ্চলটির অবস্থান আরও শক্তিশালী করা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধিতে এর অবদান বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
উন্নয়নশীল দেশের জন্য কীবৈশ্বিক বিনিয়োগের সুফল সব দেশে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। উন্নয়ন অর্থায়নের চাহিদা বাড়ছে, আর আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। ফলে বিনিয়োগকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
দোহা ফোরামে নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের আলোচনার মূল লক্ষ্য হবে, যেসব অর্থনীতি ও খাতে পুঁজির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেখানে বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ানোর উপায় খুঁজে বের করা। উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি গ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আঙ্কটাডের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আরও বৈচিত্র্যময়, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দোহা ফোরামের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই