
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ৪৪ জন শিক্ষকের প্রোফাইলে কোনো ছবি নেই। অধিকাংশ শিক্ষকের গবেষণা, প্রকাশনা ও জীবনবৃত্তান্তের (সিভি) তথ্যও হালনাগাদ করা হয়নি। আবার অনেক শিক্ষকের প্রোফাইলে প্রাতিষ্ঠানিক ছবির পরিবর্তে ভ্রমণ, পারিবারিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক মুহূর্তের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থী, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের আগ্রহী ব্যক্তিরা শিক্ষকদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছবি না থাকা শিক্ষকদের মধ্যে আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের একজন, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের পাঁচজন, আইন বিভাগের চারজন, লোকপ্রশাসন বিভাগের তিনজন, বাংলা বিভাগের চারজন, ইংরেজি বিভাগের ১৪ জন, ইসলামের ইতিহাস বিভাগের ছয়জন এবং ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের দুজন রয়েছেন। এ ছাড়া আল-ফিকহ অ্যান্ড ল', গণিত, ফোকলোর, ল' অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও ফার্মেসি বিভাগের একজন করে শিক্ষকের প্রোফাইলে ছবি নেই।
পদমর্যাদা অনুযায়ী, ছবি না থাকা ৪৪ শিক্ষকের মধ্যে ২৯ জন অধ্যাপক, ছয়জন সহযোগী অধ্যাপক, সাতজন সহকারী অধ্যাপক ও দুজন প্রভাষক।
ওয়েবসাইটে যেসব শিক্ষকের ছবি রয়েছে, তাঁদের অনেকের প্রোফাইলেও প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক ছবি ব্যবহার করা হয়নি। কোনো কোনো প্রোফাইলে রয়েছে ভ্রমণের ছবি, পরিবারের সদস্য বা সন্তানের সঙ্গে তোলা ছবি। আবার কোথাও রেস্তোরাঁ, নৌকা কিংবা লঞ্চে ভ্রমণের সময় তোলা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে এ ধরনের ছবি ব্যবহারের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারুক আহমেদের প্রোফাইলে কোনো ছবি নেই। দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. রহিম উল্লাহ, অধ্যাপক ড. আব্দুল করিম, অধ্যাপক ড. হোসাইন আহমাদ, অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান ও অধ্যাপক মুহাম্মদ মাসউদ আল মাহদীর প্রোফাইলেও ছবি নেই।
আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহজাহান মন্ডল, অধ্যাপক ড. নুরুন নাহার, অধ্যাপক ড. খন্দকার তৌহিদুল আনাম ও সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল করিম খানের ছবিও ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি।
লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. বেগম রোকসানা মিলি, অধ্যাপক ড. এম. আসাদুজ্জামান ও অধ্যাপক ড. ফকরুল ইসলামের প্রোফাইলেও ছবি নেই। বাংলা বিভাগের ছবিহীন শিক্ষকেরা হলেন অধ্যাপক ড. সারওয়ার মুর্শেদ, অধ্যাপক ড. নাসরীন আক্তার, অধ্যাপক ড. খোন্দকার আরিফা আক্তার ও অধ্যাপক ড. সাইফুজ জামান।
সবচেয়ে বেশি ছবিহীন প্রোফাইল ইংরেজি বিভাগে। এ বিভাগের ১৪ জন শিক্ষকের প্রোফাইলে ছবি নেই। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক সভাপতি ড. মিয়া রাসিদুজ্জামান, অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান, অধ্যাপক আসাদ উল্লাহ আল হোসেন, অধ্যাপক ড. এ. এইচ. এম. আক্তারুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মেহের আলী, সহযোগী অধ্যাপক শাব্বির আহমেদ, সহযোগী অধ্যাপক দিলসাদ সুরমা, সহকারী অধ্যাপক এস. এম. শোয়েব, সহযোগী অধ্যাপক ড. আজরান আজমী কাফিয়া, সহকারী অধ্যাপক আফরোজা বানু, সহকারী অধ্যাপক খন্দকার আব্দুল্লাহ হিল আল মাবুদ, সহযোগী অধ্যাপক শারমিন সুলতানা, সহকারী অধ্যাপক সোনিয়া শারমিন ও সহকারী অধ্যাপক ফেরদৌসি আক্তার।
ইসলামের ইতিহাস বিভাগের ছয় শিক্ষকের প্রোফাইলেও ছবি নেই। তাঁরা হলেন অধ্যাপক ড. রুহুল কে এম সালেহ, অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন, অধ্যাপক ড. মুহিব্বুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. তালুকদার লোকমান হাকিম, অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন ও অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল বারী।
এ ছাড়া ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রেজা ও ছুটিতে থাকা অধ্যাপক মোহাম্মদ মাসিহুল আলম, আল-ফিকহ অ্যান্ড ল' বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনোয়ারুল ওহাব, গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল আজিজ এবং ফোকলোর বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এম. মোস্তাফিজুর রহমানের প্রোফাইলে ছবি নেই। ল' অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের প্রভাষক আব্দুল্লাহ-আল-মারুফ মীম এবং ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক সজনী খাতুনের প্রোফাইলেও কোনো ছবি দেওয়া হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এমফিল গবেষক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা জরুরি। শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ওয়েবসাইট থেকে সব সময় সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। কয়েকজন শিক্ষককে ফোন করার পর জানা গেছে, তাঁরা অনেক আগেই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন।
ওই গবেষক বলেন, বাইরে থেকে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে চাইলে পরিচিত ব্যক্তি না থাকলে তাঁকে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক শিক্ষকের গবেষণার তথ্য ওয়েবসাইটে না থাকায় আগ্রহী শিক্ষার্থীরা এখানে আসার বিষয়ে উৎসাহ হারান।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কাছ থেকে সহযোগিতার পরিবর্তে অসহযোগিতা পেয়েছেন। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েও তিনি পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। পড়াশোনা ও গবেষণায় সময়, শ্রম, মেধা ও অর্থ ব্যয় করার পরও তা শেষ করতে না পারায় তিনি হতাশ হয়েছেন বলে জানান।
ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্য হালনাগাদ না থাকার কারণ জানতে চাইলে ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, তথ্য হালনাগাদ থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে অ্যাকাউন্টের লগইন ও পাসওয়ার্ড-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তথ্য আপডেট করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে ইংরেজি বিভাগের সভাপতি ড. শাহাদাৎ হোসেন আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কিছু শিক্ষকের ব্যক্তিগত উদাসীনতার কারণে বারবার জানানোর পরও তথ্য হালনাগাদ করা হয়নি। তবে নতুন পরিচালক আন্তরিকতার সঙ্গে বিষয়টি সমাধান করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষকেরা নিজেরা লগইন করে তথ্য হালনাগাদ করতে না পারলে আইসিটি সেলের উচিত কর্মশালার আয়োজন করে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ডায়েরি ও রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে পাঠানো নতুন পদায়নের অনুলিপি ব্যবহার করে আইসিটি সেল সহজেই ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের তথ্য ও পদবি হালনাগাদ করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ওয়েবসাইটের প্রযুক্তি বেশ পুরোনো। এ কারণে ওয়েবসাইটটি নতুন করে সাজানো প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ২৪ ঘণ্টা তথ্য হালনাগাদ রাখার জন্য একজন নিবেদিত ওয়েবমাস্টার নেই।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষকদের প্রোফাইল নিয়মিত হালনাগাদ না থাকার সমস্যা সমাধানে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে আইসিটি সেলের জনবলকে বিভিন্ন অনুষদে নিয়োজিত করে তথ্য হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সব তথ্যসমৃদ্ধ একটি আধুনিক ওয়েবসাইট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
ছবির পাশাপাশি শিক্ষকদের একাডেমিক পরিচিতির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ওয়েবসাইটে কয়েকজন শিক্ষকের প্রকাশনা, গবেষণা ও সিভির তথ্য পাওয়া গেলেও অধিকাংশের প্রোফাইলে এসব তথ্য নেই। ফলে তাঁদের গবেষণার ক্ষেত্র, প্রকাশনা ও একাডেমিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ওয়েবসাইট থেকে প্রয়োজনীয় ধারণা পাওয়া যায় না।
এ ছাড়া শিক্ষক তালিকায় এমন কয়েকজনের নামও রয়েছে, যাঁরা ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে গেছেন কিংবা মারা গেছেন। ফলে শিক্ষকদের ছবি, পদবি, কর্মপরিচিতি ও গবেষণাসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ডেল্টা টাইমস/এ আর খালিদ/সিআর