প্রথম বিয়ের কথা জেনে যাওয়ায় দ্বিতীয় স্ত্রীকে হত্যা, মরদেহ ফেলা হয় খালে
ডেল্টা টাইমস ডেস্ক:
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৯ পিএম (ভিজিট : ৪)

দ্বিতীয় বিয়ের সময় নিজের প্রথম বিয়ের কথা গোপন করেছিলেন স্বামী। বিষয়টি জানার পর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের (২৮) সঙ্গে মনোমালিন্য শুরু হয় তার। একপর্যায়ে স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন স্বামী রাজা মিয়া ওরফে রাজু।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বেড়ানোর কথা বলে স্ত্রীকে সাম্পান নৌকায় তুলে শিকলবাহা খালে নিয়ে যান তিনি। সেখানে সহযোগীদের নিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার পর হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি মরদেহ খালে ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনার প্রায় আড়াই মাস পর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের কথা জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিট।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন এ তথ্য জানান।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, জান্নাতুল ফেরদৌস চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শিলকূপ ইউনিয়নের বাসিন্দা। তিনি একটি জুতার কারখানায় চাকরি করতেন। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে চান্দগাঁও থানাধীন বাহির সিগন্যালের ব্যাপারীপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় দ্বিতীয় স্বামী রাজা মিয়ার সঙ্গে বসবাস করতেন। প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের সময় রাজা মিয়া নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দেন। তবে বিয়ের কিছুদিন পর জান্নাতুল জানতে পারেন, রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রী রয়েছেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করে রাজা মিয়া তার পূর্বপরিচিত মো. মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করেন। পরে তারা কালুরঘাট সেতু এলাকার এক কবিরাজের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক ও তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। এতে সমাধান না হওয়ায় জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তারা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ছয়টার দিকে রাজা মিয়া বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর অন্য পাড়ে ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে আগে থেকেই মুসলিম উদ্দিন, রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুকুর আহম্মদ এবং অজ্ঞাতনামা আরেক ব্যক্তি সাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। পরে জান্নাতুলকে নিয়ে তারা নৌকায় ওঠেন। নৌকাটি কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালে প্রবেশ করে।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাত আটটার পর নৌকায় রাজা মিয়ার সঙ্গে জান্নাতুলের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তিনি জান্নাতুলের মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন। এরপর জান্নাতুলের মুখ চেপে ধরেন তিনি। এ সময় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অন্য এক সহযোগী নৌকায় রাখা ব্যাগ থেকে রশি ও বস্তা বের করেন। রশি দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরলে জান্নাতুলের মৃত্যু হয়। পরে তার হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি করা হয়। এরপর কর্ণফুলী থানাধীন কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনের অংশে শিকলবাহা খালে মরদেহটি ফেলে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা নৌকাটি নিয়ে ব্রিজঘাট এলাকায় ফিরে যান। পরে তারা আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে ২ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন খালে ভাসমান অবস্থায় বস্তাবন্দি ও হাত-পা বাঁধা অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ-পুলিশ। পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি নিখোঁজ জান্নাতুলের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় তার মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ওরফে রাজু এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন।
গত ৬ অক্টোবর মামলাটি পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর ইউনিট তদন্তভার গ্রহণ করেন। এরপর পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক আব্দুর রহিম তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালান। একপর্যায়ে গত ১৩ অক্টোবর টেকনাফ থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা মো. মুসলিম উদ্দিনকে (৩৯) গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুকুর আহম্মদকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটিও উদ্ধার করে জব্দ করা হয়।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, গত ১৪ অক্টোবর মুসলিম উদ্দিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে তিনি নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। গ্রেপ্তার শুকুর আহম্মদকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলাটির তদন্ত চলমান রয়েছে।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই