প্রকাশ: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫৬ এএম (ভিজিট : ০)

চাকরিতে প্রবেশের সময় কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর যে অধিকার ও পদোন্নতির যোগ্যতা থাকে, পরবর্তী সময়ে প্রবিধানমালা বা বিধি সংশোধন করে তা কেড়ে নেওয়া যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাকরির প্রবিধানমালা সংশোধন করার পূর্ণ ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের থাকলেও, তা কোনোভাবেই ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর দেখিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগের অর্জিত আইনি সুবিধা/অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদার ও অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র মামলায় এমন রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে কর্মরত সাতজনের কর্মচারীর পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিরোধ সংক্রান্ত রিট আবেদন নিষ্পত্তি করে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ. এফ. এম সাইফুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১৯ আগস্ট এই রায় দিয়েছেন। ১৭ পৃষ্ঠার ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আদালতের মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি এ. এফ. এম সাইফুল করিম।
আদালতে রিটকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস.আর.এম. লুৎফর রহমান আখন্দ। অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী কবির ইকবাল হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহফুজ বিন ইউসুফ ও আক্তার হোসেন মো. আবদুল ওহাব।
প্রকাশিত রায় পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মুহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদারসহ মোট সাতজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বারি) যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ করা হয়। তৎকালীন ‘বারি প্রবিধানমালা, ২০১১’ অনুযায়ী, ফিডার পদে পাঁচ বছর চাকরি সম্পন্ন করার পর উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) থেকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে শতভাগ পদোন্নতির বিধান ছিল। রিট আবেদনকারী সাত জন প্রকৌশলীই ২০২১ সালের আগেই প্রবিধানমালা অনুযায়ী পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা অর্জন করেন।
তবে ২০২১ সালের ৯ মার্চ সরকার ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রবিধানমালা, ২০২১’ গেজেটে আকারে প্রকাশ করে। নতুন এই প্রবিধানমালার ৩২ নম্বর ক্রমিকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদটি শতভাগ পদোন্নতির পরিবর্তে ৩৩% পদোন্নতি এবং ৬৭% সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের বিধান করা হয়। বিপরীতে, ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের পদোন্নতির শতভাগ কোটা অপরিবর্তিত রাখা হয়।
নতুন এই প্রবিধানমালার ফলে পদোন্নতির অর্জিত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রিট আবেদনকারীরা ২০২১ সালে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেন।
শুনানি চলাকালে রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী এস.আর.এম. লুৎফর রহমান আখন্দ আদালতে তুলে ধরেন যে, ২০২১ সালের সংশোধিত প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগেই তার মক্কেলগণ পদোন্নতির সব শর্ত পূরণ করে অধিকার অর্জন করেছিলেন। তাই পরবর্তী সংশোধনের মাধ্যমে তাদের প্রতিকূলে পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত করা আইনত বেআইনি ও বৈষম্যমূলক।
অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পক্ষের আইনজীবী কবির ইকবাল হোসেন যুক্তি দেন, ২০১১ সালের প্রবিধানমালা রহিত করে ২০২১ সালের প্রবিধানমালা প্রবর্তন করা হয়েছে। রহিত প্রবিধানের অধীনে কেউ পদোন্নতি দাবি করতে পারেন না এবং ভালো সেবা নিশ্চিত করতে সিভিল শাখায় বিএসসি প্রকৌশলীদের সরাসরি নিয়োগের বিধান করা হয়েছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, দুই পক্ষের বক্তব্য ও নথি পর্যালোচনা করে আমরা এই মর্মে সিদ্ধান্ত প্রদান করছি যে, ইতোপূর্বে প্রবিধান সংশোধনীর আগেই যারা পদোন্নতির জন্য যোগ্য হয়েছিলেন, সেই রিট আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে নব প্রণীত পদোন্নতির প্রবিধান, ২০২১ ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। রিট আবেদনকারীরা পূর্ববর্তী প্রবিধান, ২০১১-এর অধীনে অর্জিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকারের অধিকারী। পরবর্তীকালে প্রবিধানে কোনো পরিবর্তন আনার মাধ্যমে তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।
সুতরাং, সংশোধিত প্রবিধান, ২০২১ কার্যকর হওয়ার আগে যেসব আবেদনকারী পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত চাকরিকাল, যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করেছিলেন, তাদের পদোন্নতির বিষয়টি পুরোনো প্রবিধান, ২০১১-এর বিধান অনুযায়ী কঠোরভাবে বিবেচনা করতে হবে।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই