হাম নির্মূলের দ্বারপ্রান্ত থেকে ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশ

ডেল্টা টাইমস ডেস্ক:

জাতীয়

একসময় হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু টিকাদানে ঘাটতি ও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কারণে এখন

2026-09-09T18:17:26+06:00
2026-09-09T18:17:26+06:00
বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

রয়টার্সের প্রতিবেদন
হাম নির্মূলের দ্বারপ্রান্ত থেকে ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশ
ডেল্টা টাইমস ডেস্ক:
প্রকাশ: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:১৭ পিএম   (ভিজিট : ০)

একসময় হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু টিকাদানে ঘাটতি ও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কারণে এখন দেশটি হাম রোগের ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চে প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত হাম-সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯৯-এ। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে, দেখা দিয়েছে শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট, আর প্রতিদিনই বাড়ছে হাম আক্রান্ত শিশুদের ভর্তির সংখ্যা।


এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কারণেই শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল—যে সময়টায় রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল দেশ।


যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশেই।


স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত এবং টিকা সরবরাহে সমস্যার ফলেই বিপুলসংখ্যক শিশু হাম থেকে সুরক্ষাহীন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ এই বয়সে নিয়মিত হামের টিকা দেওয়ার সুযোগ থাকে না।


স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে দেশে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে ১৯ হাজার ৮৩৫ জন। হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯, যার মধ্যে ১০০টি মৃত্যু পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী।


টিকাদানে বড় ঘাটতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ আকার নেওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে দুর্বল কর্মসূচি তদারকি, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং টিকা সংগ্রহের নীতিতে পরিবর্তন।


স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার ফলেই সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। সোমবার সংসদে তিনি বলেন, এই পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণেই সংকট তৈরি হয়েছিল। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত করা এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিল করার ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।


গত এক দশকে হাম প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সাময়িকভাবে টিকাদানের হার কমে যাওয়া ছাড়া বেশির ভাগ সময়ই দেশে হাম টিকার আওতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি ছিল।


রোগতত্ত্ববিদ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে ঘাটতির কারণেই বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। তিনি বলেন, এর আগে বাংলাদেশে কখনো এত বেশিসংখ্যক শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যায়নি, একই বছরে এত রোগীও দেখা যায়নি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আক্রান্ত ও মৃতদের বড় অংশই শিশু। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, টিকার আওতা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন তিনি।


রোগীর চাপে বিপর্যস্ত হাসপাতাল

হামের পাশাপাশি দেশে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপও, ফলে একসঙ্গে দুটি সংক্রামক রোগের চাপ সামলাতে গিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা।


স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছর এ পর্যন্ত ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার একদিনেই ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৯ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন—চলতি বছরের একদিনে যা সর্বোচ্চ।


ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা বরাদ্দ থাকলেও রোগীর চাপ এত বেশি যে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক চিকিৎসক নন্দদুলাল সাহা বলেন, রোগী এত বেশি আসছে যে সবাইকে জায়গা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, ১ হাজার ৩৫০ রোগীর ধারণক্ষমতা থাকা হাসপাতালটিতে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হাম রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত শিশুদের স্যালাইনের সংকটও, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।


টিকা না পাওয়ার অভিযোগ


হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশুরা। পরিবারগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে ঘুরতে হচ্ছে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে, সঙ্গে বাড়ছে চিকিৎসার খরচও।


৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগমের ১৩ মাস বয়সী ছেলে প্রায় দুই মাস আগে হাম আক্রান্ত হয়। চারটি হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত একটি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। ১০ দিন পর ছাড়পত্র মিললেও তার জ্বর এখনো ফিরে আসছে, পুরোপুরি সুস্থ হয়নি সে। নাসিমা জানান, অসুস্থ থাকার কারণে সময়মতো ছেলেকে টিকা দেওয়া যায়নি, আর পরে টিকাদান কেন্দ্রে গেলে জানানো হয় সেখানে টিকা নেই। অথচ তার আগের চার সন্তান নিয়মিতভাবেই টিকা পেয়েছিল।


একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে আরেকটি পরিবারও। কারখানাশ্রমিক মোহাম্মদ রিপনের আট মাস বয়সী মেয়ের শরীরে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার কয়েক দিন পর আবারও ফুসকুড়ি ও হামের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টার পর শেষে বিশেষায়িত হাম হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হয় তাদের। রিপন বলেন, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন তারা, কিন্তু সঠিক তথ্য পাচ্ছেন না।


জরুরি টিকাদানেও পুরোপুরি কাটছে না সংকট

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার, যাতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।


তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি কর্মসূচি দিয়ে সংকট পুরোপুরি সমাধান হবে না—নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রয়োজন যেসব শিশু আগে টিকা পায়নি তাদের জন্য বিশেষ ‘ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচি।


হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ, যাতে সাধারণত জ্বর ও শরীরে বিশেষ ধরনের লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তবে দুই ডোজ টিকা নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।


নাসিমার ভাষায়, “আমি শুধু চাই, আমার ছেলে সুস্থ হয়ে উঠুক। আর কোনো মাকে যেন নিজের সন্তানকে এই রোগে কষ্ট পেতে বা মারা যেতে না হয়।”










  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ