চারপাশে সবুজের সমারোহ। কোথাও দেশীয় নানা প্রজাতির বৃক্ষ, কোথাও গ্রামীণ জীবনের পুরোনো উপকরণ। রয়েছে হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতির নানা নিদর্শন, ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র, নদীকেন্দ্রিক জীবনের স্মৃতি আর মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এমনই এক পরিবেশে বাংলাদেশের উত্তর জনপদের ইতিহাস, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা এলাকায় অবস্থিত লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর পরিদর্শন করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। এ সময় তার স্ত্রীও সঙ্গে ছিলেন।
জাদুঘরে পৌঁছালে রাষ্ট্রদূত ও তার স্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এবং ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান।
পরিদর্শনের শুরুতেই ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান রাষ্ট্রদূতকে লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পটভূমি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানান। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, জীববৈচিত্র্য, লোকজ সংস্কৃতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনধারা, নদী ও পরিবেশ, ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে জাদুঘরের কার্যক্রমও তুলে ধরেন তিনি।
এরপর রাষ্ট্রদূত ও তার স্ত্রী একে একে জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ঘুরে দেখেন। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গ্যালারি থেকে শুরু করে লোকজ পুতুল ও খেলনা, নদী, সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, বাদ্যযন্ত্র, তৃণমূলের লোকজ, বিজ্ঞান, বৃক্ষ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি পরিদর্শন করেন তারা।
গ্যালারিগুলোতে সংরক্ষিত পুরোনো দিনের গ্রামীণ জীবনের নানা উপকরণ, লোকজ সংস্কৃতির নিদর্শন, দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ও প্রকৃতি-নির্ভর সংগ্রহ সম্পর্কে আগ্রহ নিয়ে জানতে চান রাষ্ট্রদূত ও তাঁর স্ত্রী। বিশেষ করে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনজীবনের সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসা বিভিন্ন ঐতিহ্যকে একই পরিসরে সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের উদ্যোগ তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
পরিদর্শনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল জাদুঘরের বৃক্ষ গ্যালারি। এখানে শুধু বৃক্ষের নমুনা নয়, জীবন্ত বৃক্ষকেই সংগ্রহ হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা বৃক্ষপ্রজাতি পর্যায়ক্রমে এখানে রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ২৫০ প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। প্রতিটি প্রজাতিকে সংরক্ষণ ও পরিচিত করে তোলার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে দেশের উদ্ভিদবৈচিত্র্য সম্পর্কে জানানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারিতেও সময় কাটান রাষ্ট্রদূত ও তার স্ত্রী। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, স্মৃতিচিহ্ন ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন সংগ্রহ তাঁদের দেখানো হয়।
প্রকৃতির নিবিড় পরিবেশে গড়ে ওঠা লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘরের সংগ্রহ ও উপস্থাপনা দেখে প্রশংসা করেন ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও লোকজ ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন তিনি। ইএসডিওর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, কৃষিনির্ভর জীবন, নদী ও পরিবেশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য, ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র, বৃক্ষসম্পদ এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ইতিহাস সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে আসছে।

প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ জাদুঘর ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি গবেষক, শিক্ষার্থী, উন্নয়নকর্মী ও দর্শনার্থীদের কাছে উত্তর জনপদের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও ঐতিহ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের এই স্থানীয় উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে ঢাকা পোস্টকে জানান জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।
লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘরের চেয়ারম্যান এবং ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীববৈচিত্র্য ও গ্রামীণ জীবনধারাকে সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। এখানে আমরা শুধু নিদর্শন সংগ্রহ করে রাখছি না, বরং প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের যে নিবিড় সম্পর্ক, সেটিও তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
তিনি আরও বলেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও তার স্ত্রী আমাদের জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন, এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের বিষয়। তাঁরা বিভিন্ন গ্যালারি ঘুরে দেখেছেন এবং আমাদের সংরক্ষণ কার্যক্রম সম্পর্কে আগ্রহ নিয়ে জানতে চেয়েছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই পরিদর্শন আমাদের সেই কাজকে আরও উৎসাহিত করবে এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে ভূমিকা রাখবে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘরে এসে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। এখানে দেশের গ্রামীণ জীবন, লোকজ ঐতিহ্য, বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ, ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি যেভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
এসময় উপস্থিত ছিলেন, জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারি কমিশনার রুহুল আমিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলমগীর রহমান প্রমুখ।
এর আগে গতকাল সোমবার (৩১ আগস্ট) ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী সীমান্তে সমতলের চা-বাগান ও ঐতিহ্যবাহী সূর্যপুরী আমগাছ পরিদর্শন করে প্রশংসা করেন মার্কিন এই কূটনীতিক। তার সঙ্গে স্ত্রী ও কয়েকজন সফরসঙ্গী ছিলেন।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই