
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ভারত এখনো স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি, বরং বিষয়টিকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রেখে সময় নিচ্ছে। এর মধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে ভারতের আগ্রহ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভারতীয় হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক দিল্লি সফর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠক, এবং সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার নানা ইঙ্গিত—সব মিলিয়ে এই আগ্রহ এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
দুই দেশের অগ্রাধিকার আসলে ভিন্ন জায়গায়। ঢাকার মূল দাবি শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা, আর দিল্লির লক্ষ্য বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ককে কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া। এই ভিন্নতার মধ্যেই সম্ভাব্য তারেক-মোদি বৈঠক একটি নতুন কূটনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে। প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারতের বক্তব্য একই রকম—অনুরোধটি প্রতিষ্ঠিত আইনি কাঠামোয় পর্যালোচনাধীন এবং অগ্রগতি হলে জানানো হবে।
তবে এই স্পর্শকাতর অবস্থানের মধ্যেও দিল্লি যে যোগাযোগ বাড়াতে চায়, তার আভাস স্পষ্ট। বাংলাদেশ ভারতের কাছে শুধু রাজনৈতিক অংশীদার নয়—সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রশ্ন উঠছে—প্রত্যর্পণ ইস্যু ঝুলিয়ে রেখেও কি ভারত তারেক রহমানের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের সূচনা করতে প্রস্তুত?
ভারতের সামনে দ্বিধাও কম নয়। হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশের জনমনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করে সম্পর্ক গভীর করা সহজ নয়। আবার শুধু এই ইস্যুতে আটকে থাকলে ভারতের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই দিল্লি সম্ভবত দ্বিমুখী কৌশল নিচ্ছে—একদিকে আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো।
যেসব বিষয়ে আলোচনা এগোচ্ছে
ভারতের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে ক্রিকেট সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, জ্বালানি সহযোগিতা সম্প্রসারণ, কিছু বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন। একজন ঊর্ধ্বতন ভারতীয় কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যা চাইবে, ভারত তার চেয়েও বেশি দিতে প্রস্তুত—তবে শর্ত হলো, তা হতে হবে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে, কোনো চাপের মুখে নয়।
জ্বালানি খাতেও অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ পাইপলাইনের মাধ্যমে বাড়তি জ্বালানি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে, আর ভারতের প্রতিক্রিয়া মোটের ওপর ইতিবাচক—যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে চাহিদা, পরিশোধন সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ জোগানের ভারসাম্যের ওপর। ক্রিকেট সম্পর্কের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দূরত্ব কাটিয়ে ওঠার আলোচনা চলছে বলে জানা যাচ্ছে।
সামনে কী
সফরের দিনক্ষণ এখনো অনিশ্চিত, আর বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্যও আসছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—তারেক রহমানকে ঘিরে দিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, সফর সফল হলে তা শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও জনসম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন গতি আনতে পারে। মূল প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—হাসিনা ইস্যুতে নীরবতা বজায় রেখেও কি দুই দেশ সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারবে?