প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ৩:০৩ পিএম আপডেট: ১৩.০৮.২০২৬ ৩:০৫ পিএম (ভিজিট : ৫)

ছবি: ডেল্টা টাইমস
একদিকে বৈরী আবহাওয়া, অন্যদিকে কাঁচা ও দুর্গম সড়ক, কোথাও নদীপথ। বর্ষায় কোথাও কোমরসমান পানি, কোথাও ভাঙাচোরা রাস্তা। এসব প্রতিকূলতা পেরিয়েও থেমে নেই শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ। প্রতিদিনই প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়ে পৌঁছে যাচ্ছে ডিম, কলা ও পুষ্টিকর বনরুটি। এতে একদিকে শিশুদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির আগ্রহ।
সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পাইলট ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচির এমনই একটি চিত্র দেখা গেছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলায়। সরকারের নির্দেশনায় কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুশীলন। দুর্যোগপ্রবণ এই জনপদে নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেও সংস্থাটি নিয়মিত শিক্ষার্থীদের কাছে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে।
শ্যামনগর উপজেলার ১৯১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৫ হাজার ৮১৫ শিক্ষার্থী এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ছয়টি উপজেলার মধ্যে শ্যামনগরেই সবচেয়ে বেশি বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীকে কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশুদের জন্য প্রতিদিনের এই খাবার পরিবার ও বিদ্যালয়, দুই পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্যামনগরের ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় খাবার পৌঁছাতে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ৩০টি বিদ্যালয়ে খাবার পৌঁছে দিতে অনেক সময় পিকআপের পাশাপাশি ট্রলারের ওপরও নির্ভর করতে হয়। বর্ষা কিংবা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কাঁচা সড়ক ও নদীপথে খাদ্য পরিবহন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোথাও রাস্তা পানিতে তলিয়ে যায়, কোথাও নদী ও খালের ওপর নির্ভর করে খাবার পরিবহন করতে হয়। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই বেড়ে যায়। তবুও নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে খাবার পৌঁছে দিতে কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
১৬২ নম্বর আটুলিয়া আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীনেশ চন্দ্র মন্ডল বলেন,‘ স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালুর পর বিদ্যালয়ে শুধু শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিই বাড়েনি, নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির হারও বেড়েছে। অভিভাবকদের মধ্যেও সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুরা পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে। এ কারণে কর্মসূচিটি শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য এটি বাড়তি সহায়তা। ’
ওই বিদ্যালয়ের অভিভাবক জেসমিন আক্তার বলেন, ‘ আমাদের মতো নিম্নবিত্ত ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার পরিবারের জন্য প্রতিদিন স্কুলে এমন খাবারের ব্যবস্থা হওয়া খুবই স্বস্তির। অনেক দিন পর্যাপ্ত খাবার না খেয়েই সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে হতো। এখন স্কুলে ডিম, কলা ও পুষ্টিকর বনরুটি পাওয়ায় শিশুরা স্কুলে যেতে আগ্রহী হচ্ছে।’
দেশের চার জেলার ছয়টি উপজেলায় বর্তমানে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সুশীলন। এর মধ্যে শ্যামনগরেই কার্যক্রম পরিচালনায় সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে জানান সংস্থাটির উপপরিচালক শাহিনা পারভীন।
তিনি বলেন,‘ উপকূলীয় এই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নদী ও খালবেষ্টিত। অনেক বিদ্যালয়ে সড়ক যোগাযোগ দুর্বল। বর্ষা ও দুর্যোগের সময় যোগাযোগব্যবস্থা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় ট্রলারে মালামাল পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। পাশাপাশি খাবার ভিজে যাওয়া বা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সব ধরনের সংকট মোকাবিলা করে তারা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। শিশুদের পুষ্টি সুরক্ষা এবং সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তারা বদ্ধপরিকর। দুর্যোগের সতর্কবার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হয়।’
সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. এনামূল হক বলেন, ‘ উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। শ্যামনগরের মতো দুর্গম এলাকায় প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও নিয়মিত স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। এরপরও সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এই কর্মসূচির ফলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি ঝরে পড়া রোধেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কর্মসূচির মান, খাবারের গুণগত মান ও নিয়মিত বিতরণ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে। ’
স্থানীয়দের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পর্যাপ্ত পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দরিদ্র ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার অনেক পরিবারের পক্ষে প্রতিদিন শিশুর জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা কঠিন। বিদ্যালয়ভিত্তিক খাবার কর্মসূচি সেই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শিশুরা বিদ্যালয়ে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পাওয়ায় তাদের উপস্থিতি বাড়ছে। একই সঙ্গে নতুন করে ভর্তির আগ্রহ তৈরি হচ্ছে এবং ঝরে পড়ার প্রবণতাও কমছে বলে মনে করছেন শিক্ষক ও স্থানীয়রা। ফলে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষায় তাদের ধরে রাখার ক্ষেত্রেও স্কুল ফিডিং কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ শ্যামনগরের মতো এলাকায় প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিদিন খাবার পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে ভূমিকা রাখছে।
ডেল্টা টাইমস/ আরএফ