মীর জুমলার কামান ও ঢাকার মশা

মোঃ রাসেল রহমান

মতামত

আপনি কী মীর জুমলার কামান দেখেছেন? মীর জুমলা সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতিনিধি হিসেবে ১৬৬০-১৬৬৩ সালে বাংলার সুবেদার ছিলেন। মীর

2026-08-09T16:21:39+06:00
2026-08-09T16:21:39+06:00
রবিবার, ০৯ আগস্ট, ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

মীর জুমলার কামান ও ঢাকার মশা
মোঃ রাসেল রহমান
প্রকাশ: রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২১ পিএম   (ভিজিট : ০)

আপনি কী মীর জুমলার কামান দেখেছেন? মীর জুমলা সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতিনিধি হিসেবে ১৬৬০-১৬৬৩ সালে বাংলার সুবেদার ছিলেন। মীর জুমলার কামানের নাম বিবি মরিয়ম। বিবি মরিয়মকে দেখতে হলে আপনাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর সংলগ্ন ঢাকা গেইটে আসতে হবে। ৬৪ হাজার ৮১৫ পাউন্ড ওজনের কামানটি ১৭ শতকের মাঝামাঝি আসাম যুদ্ধে বাংলার সুবেদার কামানটি ব্যবহার করেছিলেন। তবে তিনি মোঘল আমলে কামানটি মশা নিধনে ব্যবহার করেছিলেন কি না সেটি ইতিহাস থেকে জানা যায় না।

 ৪১৬ বছর পূর্বে ১৬১০ সালে সর্বপ্রথম ঢাকা শহর রাজধানীর মর্যাদা  লাভ করেছিল। আরও প্রায় দুইশো বছর পর ১৮৬৪ সালের ১ আগস্ট ঢাকা পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্যে দিয়ে আধুনিক নগর প্রশাসনের সূচনা হয়। কালের পরিক্রমায় ১৯৯০ সালে নগর প্রশাসন ঢাকা সিটি প্রশাসন কর্পোরেশন নাম ধারন করে। সর্বশেষ ২০১২ সালে এটি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন বিভক্ত হয়। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেষে যে শহরটি উৎপত্তি হয়েছিল। সেটি আজ প্রথিবীর অন্যতম বৃহৎ মেগাসিটি। এই আধুনিকতার যুগেও প্রাচীন এক প্রাণী আমাদের জীবননাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। মোঘল আমলে একটি দুফুট লম্বা কামান বানাতে খরচ হতো তখনকার দিনের দেড় লক্ষ টাকা। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে ব্যয় করতে হয়েছে প্রায় ২৩৩ কোটি টাকা। প্রশ্ন হচ্ছে এই টাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে ১ টি করে কামান বসালে কি মশক নিধন করা যেতো।–উত্তর হচ্ছে না।  

 দুই সিটি কর্পোরেশন মশা মারতে কামান না ব্যবহার করলেও মাশা মারার জন্য কোনো পদ্ধতির ব্যবহার বাকি রাখে নাই। মশা মারার জন্য কীটনাশক প্রয়োগ, ফগিং বা ধোঁয়া দেওয়া, গাপ্পি মাছ ছাড়া, হাঁস ছাড়া থেকে শুরু করে বর্তমানে বিটিআই পদ্ধতির ক্যাপসুল ট্যাবলেট প্রয়োগ । সব পদ্ধতির প্রয়োগই করা হয়েছে । এসব পদ্ধতি কিন্তু দৈবচয়ন ভিত্তিতে হয়নি। রীতিমত বিশেষজ্ঞদের  মতামত বা সুপারিশের ভিত্তিতে এসব পদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মশক নিধনে কোনো পদ্ধতি বা কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হবে তা ঠিক করে বিশেষজ্ঞ কমিটি। এই কমিটিতে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা এবং কীটতত্ত্ববিদরা রয়েছেন। এই কমিটিই নির্ধারন করে দেয় কোনো ঔষধ কত মাত্রায় কত মাস ব্যবহার করা হবে । অর্থাৎ বর্তমান মশক নিধনে ব্যবহৃত পদ্ধতি কোনো খামখেয়ালিপনা নয় বরং একটি সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট, চেঙ্গিস খান, লর্ড বায়রন, যশ চোপড়া এই সব সব নামগুলো মধ্য কোনো মিল রয়েছে? - আছে, একজায়গায় সবাই মশার কামড়ে এই পৃথিবী  ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ মানুষের জীবনের জন্য মশা একটি ঐতিহাসিক হুমকি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ থেকে ২০২৫ এই ৩ বছরে কেবল বাংলাদেশে ২ হাজার ৬৮৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ লাখের ঊর্দ্ধে।

 প্রশ্ন উঠতে পারে- মশা মারার বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করলেও এত বিপুল সংখ্যাক মানুষ কেন প্রতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। উত্তরটি সহজ না হলেও সরল। মশক নিধনে জনগণ সতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছে না বরং মশক নিধনকে কেবল সরকারের দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচনা করছে। ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশন অধিভুক্ত এলাকাকে আমরা উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারি। ডিএসসিসির প্রাক বর্ষা এডিস লার্ভা জরিপে ৭৫ টি  ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩ ওয়ার্ডে মশার ঘনত্ব নির্দিষ্ট সূচকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭ টি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। জরিপে পরিদর্শণকৃত ২ হাজার ২৩৮টি বাড়ির মধ্যে ২৮১ টি ওয়ার্ডে বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা (লার্ভার পরের স্তর) পাওয়া গেছে। জরিপ অনুযায়ী বংশ বিস্তারের জন্য এডিস মশার সবচেয়ে বেশি পছন্দ মেঝেতে জমানো পানি (১২.২৬শতাংশ) তারপর দ্বিতীয় পচ্ছন্দ বালতিতে জমানো পানি (১০.৩৪শতাংশ) এবং তৃতীয় পছন্দ প্লাস্টিক ডোম (৮.৮৯শতাংশ)। অর্থাৎ এই ৩টি প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করতে পারলেই প্রায় ৩ ভাগের ১ ভাগ এডিস মশা নির্মুল করা সম্ভব। 

 মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। কেননা, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো ভ্যাকসিন নেই, সুনির্দিষ্টভাবে কার্যকর ওষুধও নেই। তবে মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ আমাদের চারপাশে আছে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং চারপাশ পরিষ্কার রাখা জরুরি।

 ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায় হলো এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ। এর জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি। কারণ এডিস মশার উৎপত্তিস্থল হলো আমাদের বাড়ির ভেতর, বাইর, ছাদ এবং বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা পানি। তাই আমাদের উচিত বাড়ির আঙিনা সব সময় পরিষ্কার রাখা। বাড়ির আনাচে-কানাচে জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় পাত্রসমূহ ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া। ব্যবহারযোগ্য পাত্র, যেমন- ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, এয়ার কন্ডিশনার এবং রেফ্রিজারেটরের নিচের পানি ভর্তি পাত্রে যেন কোনোভাবেই একনাগাড়ে পাঁচদিনের বেশি পানি জমে না থাকে। মূলত এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য সকল নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ একান্ত জরুরি।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল হাসপাতালে নয়, শুরু হতে হবে মানুষের বাড়ি, বিদ্যালয়, কর্মস্থল এবং স্থানীয় জনসমাজ থেকে। রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া, দরিদ্র রোগীদের সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু ও ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

বৃষ্টিকে যদি ডেঙ্গুর জন্য শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সংকট আরও গভীর হবে। কিন্তু বৃষ্টির পর যদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা যায়, তাহলে ডেঙ্গুর এই বার্ষিক দুর্ভোগ থেকে দেশকে ধীরে ধীরে মুক্ত করা সম্ভব।

ডেঙ্গু জ্বরে শরীরের তাপমাত্রা ১০২ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। এ সময় মাথায় পানি দেওয়া ও শরীর মুছে দেওয়ার মাধ্যমে জ্বর কমাতে হবে। এছাড়া ছয় থেকে আট ঘণ্টা পরপর জ্বরের তীব্রতা বুঝে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ দিতে হবে। ডেঙ্গু জ্বরের মূল চিকিৎসা হলো শরীরে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাপনা। পানির পাশাপাশি ফলের রস, স্যুপ, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, শরবত প্রভৃতি তরল খাবার খাওয়াতে হবে।ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূলমন্ত্রই হলো এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা। এডিস মশা স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মশক নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

 সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার পক্ষে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূলকরণে এককভাবে সহজ নয়।এজন্য সংশ্লিষ্ট সকল  মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর,  সংস্থার অংশগ্রহণ এবং সহযোগিতা প্রয়োজন। নির্মাণাধীন ভবনের জমা রাখা পানিতে যাতে এডিস মশার লার্ভা না থাকে সে বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহ  এবং রিহাবের মাধ্যমে ব্যবস্থা  গ্রহণ করা হয়েছে।স্ব স্ব মন্ত্রণালয়/ বিভাগ/ নিজ নিজ মালিকানা/পরিচালনাধীন ভবনসমূহে মশার আবাস চিহ্নিত এবং  মশা নিমূলের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। সে ক্ষেত্রে সিটি  করপোরেশন বা পৌরসভা প্রয়োজনে কারিগরি সহায়তা  প্রদান করতে পারে।

 ২৩ জুন ২০২৬ সালে উপযুক্ত কমিটির ১ম সভায় জাতীয় কমিটির গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন কাজ পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদানের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকগণকে সযুক্ত করতে প্রতিদিন সমাবেশের সময় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ডেঙ্গু সচেতনতামূলক বক্তব্য প্রদান, স্কুলে লিফলেট বিতরণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, যুবসমাজকে সংযুক্ত করতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার, দেশের এনজিওসমূহ, ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন সোসাইটিকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক প্রচারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

 সরকার ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যেহেতু এডিস মশা বসতবাড়ির ভিতরে ও নিজ আঙিনার চারিপাশে স্বচ্ছ পানিতে জন্মায়, সেহেতু ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের অংশগ্রহণই মুখ্য। সরকার ইতোমধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতি শনিবার নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার ও জমানো পানি ফেলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। নিজের জীবন এবং প্রিয়জনদের জীবন ডেঙ্গুর হাত থেকে বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাঁড়া দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তা না হলে মোড়ে মোড়ে মীর জুমলার বিবি মরিয়ম বসিয়েও লাভ নেই। ( পিআইডি ফিচার ) 

লেখক:  জনসংযোগ কর্মকর্তা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।


ডেল্টা টাইমস/ আরএফ 








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ