প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:৩৭ এএম (ভিজিট : ২)

দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতায় ভুগছে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। প্রতি বর্ষায় অল্প বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় শহর থেকে শুরু করে গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা। এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে বারবার উঠে এসেছে নদী ও খালের অবৈধ দখল। বছরের পর বছর নদীর জমি দখল করে গড়ে উঠেছে ইটভাটা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, মাছের ঘের, কৃষিজমি, পুকুর ও বসতবাড়ি। এতে কপোতাক্ষ, ইছামতি, বেতনাসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ নদী ও খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এ অবস্থায় অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানে নামছে জেলা প্রশাসন। ইতোমধ্যে কপোতাক্ষ, ইছামতি, বেতনা নদী এবং জেলার বিভিন্ন নৌ-খালের ৩০২ জন অবৈধ দখলদারের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। একইসঙ্গে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার কর্মপরিকল্পনাও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) পর্যায়ে সরেজমিন তদন্ত, জমির রেকর্ড যাচাই ও পুনঃতদন্ত শেষে তালিকাটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। পরে সেটি জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলার বাবুলিয়া মৌজায় নদীর জমি দখল করে পরিচালিত হচ্ছে 'কামরুল এসবিবি' ও 'মনির এসবিএল' নামে দুটি ইটভাটা। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ বিঘা ৮ কাঠা নদীর জমি দখল করে এসব ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর এসব স্থাপনা বহাল থাকায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনে সৃষ্টি হচ্ছে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা।
সদর উপজেলার বিনেরপোতা এলাকায় বেতনা নদীর তীরে নির্মাণাধীন হাসান ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড-এর বিরুদ্ধেও নদীর জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। জেলা প্রশাসনের তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির দখলে রয়েছে প্রায় ১ দশমিক ১৮৭ বিঘা নদীর জমি। নদীর সীমানার মধ্যে প্রাচীর ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি নৌ-খাল দখল করে মাছের ঘের, ধান চাষ এবং বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। অনেক খালের অস্তিত্ব এখন প্রায় বিলীন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শহর ও আশপাশের এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা গেছে তালা উপজেলার মাগুরা, জগদানন্দকাটি, পুটিয়াখালী, রাজেন্দ্রপুর ও জালালপুর মৌজায়। জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী, এসব এলাকায় শতাধিক ব্যক্তি কপোতাক্ষ নদীর জমি দখল করে স্থায়ী ও অস্থায়ী বসতি, পুকুর এবং কৃষিজমি তৈরি করেছেন।
জেলা প্রশাসনের কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বর্ষা মৌসুমের মধ্যেই নদীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ উদ্ধার করতে ৫০ দিনের বিশেষ (ক্র্যাশ) অভিযান পরিচালনা করা হবে। পর্যায়ক্রমে সব অবৈধ দখল উচ্ছেদের পাশাপাশি পানি চলাচলের পথে থাকা প্রতিবন্ধকতাও অপসারণ করা হবে। তবে এ কাজে পর্যাপ্ত জনবল, লজিস্টিক সহায়তা এবং নদীর জমিতে বসবাসকারী ভূমিহীন পরিবারগুলোর পুনর্বাসনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে শহরের বাইপাস সড়ক-সংলগ্ন একটি খাল থেকে অবৈধ নেট-পাটা অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এ অভিযান ধারাবাহিকভাবে চলবে।
সমাজসেবক ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় সংকট এখন জলাবদ্ধতা। ব্যক্তি স্বার্থে যারা খাল-নদী দখল করে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নদী দখলমুক্ত না হলে এই সংকট থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি মিলবে না।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সাতক্ষীরার সভাপতি তৈয়ব হাসান সামছুজ্জামান বাবু বলেন, নদী ও খাল দখলমুক্ত করা গেলে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হবে, কমবে জলাবদ্ধতা। তবে অভিযান যেন শুধু ছোট দখলদারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধেও সমানভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।
জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, খাল, ড্রেন ও পানি চলাচলের পথ পরিষ্কারের কাজ চলমান রয়েছে। নতুন করে কেউ দখল বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বড় অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধেও যথাযথ নোটিশ দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এর আগে নদী দখলমুক্ত করতে একাধিকবার তালিকা প্রকাশ ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ ছিল। ফলে এবার ৩০২ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা প্রকাশের পর শুরু হতে যাওয়া অভিযান শেষ পর্যন্ত কপোতাক্ষ, ইছামতি ও বেতনা নদীকে দখলমুক্ত করতে পারে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন সাতক্ষীরার মানুষ। জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে এ অভিযান কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই