বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আমের নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লব

রেহানা ফেরদৌসী:

মতামত

বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার নাম এখন “আম”। যে ফল একসময় শুধুই গ্রীষ্মের মৌসুমি আনন্দ হিসেবে বিবেচিত হতো,

2026-05-16T11:56:59+06:00
2026-05-16T12:00:32+06:00
রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আমের নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লব
রেহানা ফেরদৌসী:
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ১১:৫৬ এএম   (ভিজিট : ৫০)

বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার নাম এখন “আম”। যে ফল একসময় শুধুই গ্রীষ্মের মৌসুমি আনন্দ হিসেবে বিবেচিত হতো, আজ সেটিই হয়ে উঠতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম শক্তিশালী খাত। বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম আম উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও আশানুরূপ নয়। দেশে বছরে ২৪ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি আম উৎপাদিত হলেও রপ্তানি হয় মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন। বৈশ্বিক আম রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখনো ০.১ শতাংশেরও কম।

তবে এই চিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা।সাতক্ষীরা দেখিয়ে দিয়েছে- সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ উৎপাদন এবং আধুনিক বিপণন নিশ্চিত করা গেলে “বাংলাদেশি আম” বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম।

সাতক্ষীরা : বাংলাদেশের আম রপ্তানির নতুন প্রবেশদ্বার

একসময় সাতক্ষীরা মূলত চিংড়ি শিল্প ও উপকূলীয় ভূপ্রকৃতির জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু গত এক দশকে এই জেলার কৃষি ব্যবস্থায় এসেছে বড় পরিবর্তন। বর্তমানে আশাশুনি, তালা, কলারোয়া, দেবহাটা, শ্যামনগর ও সদর উপজেলাজুড়ে গড়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ বাণিজ্যিক আমবাগান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন ঘেঁষা লবণাক্ত-মিষ্টি মাটির বৈশিষ্ট্য, দীর্ঘ গ্রীষ্মকাল এবং তুলনামূলক কম শীতের কারণে সাতক্ষীরার আম দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ দিন আগে পাকে। এটাই সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা।মে মাসের প্রথম সপ্তাহে যখন রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম কেবল গুটি অবস্থায় থাকে, তখন সাতক্ষীরার গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ কিংবা হিমসাগর ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পৌঁছে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে এই “আর্লি সিজন” ধরতে পারাটাই সাতক্ষীরাকে অন্যসব অঞ্চল থেকে আলাদা করেছে। ভারত, পাকিস্তান কিংবা থাইল্যান্ডের আম বাজারে আসার আগেই সাতক্ষীরার আম বিদেশি সুপারশপে জায়গা করে নিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক বেশি মূল্যও পাওয়া যাচ্ছে।

বিশ্ববাজারে সব আম সমান গ্রহণযোগ্য নয়। বিদেশি ক্রেতারা সাধারণত চারটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন-

* দীর্ঘ শেলফ লাইফ
* আঁশহীন বা কম আঁশযুক্ত শাঁস
* আকর্ষণীয় রঙ ও নির্দিষ্ট আকার
* নিরাপদ ও রাসায়নিকমুক্ত উৎপাদন

এই বিবেচনায় বাংলাদেশের কয়েকটি আমের জাত আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ সম্ভাবনাময় বলে বিবেচিত হচ্ছে।

হিমসাগর / ক্ষীরশাপাতি : বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সম্ভাবনাময় রপ্তানিযোগ্য জাত। আঁশহীন, সুগন্ধি ও অত্যন্ত মিষ্টি হওয়ায় ইউরোপীয় বাজারে এর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি ও কানাডায় এই জাতের বড় বাজার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ল্যাংড়া :
টক-মিষ্টির ভারসাম্যপূর্ণ স্বাদ ও বিশেষ সুগন্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

আম্রপালি : আকারে ছোট হলেও এর রঙ অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং শেলফ লাইফ দীর্ঘ। জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত বাজারে পাওয়া যায় বলে এটি “লেট সিজন ম্যাংগো” হিসেবে ইউরোপীয় বাজারে বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

গোপালভোগ : ছোট আঁটি, অধিক মিষ্টতা ও রসালো শাঁসের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

ফজলি : আকারে বড় হওয়ায় সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি জুস, পাল্প ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পে ব্যবহারের জন্য আদর্শ।

বারি আম-৪ ও কাটিমন : বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বারি আম-৪ এবং বারোমাসি কাটিমন ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় রপ্তানিযোগ্য জাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে অফ-সিজন বাজার ধরতে কাটিমনের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল।

সাতক্ষীরার সাফল্যের মূল রহস্য : মান নিয়ন্ত্রণ

সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করা। ২০১৬ সালের পর থেকে অনেক বাগানে ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ পদ্ধতি চালু হয়েছে। ছোট অবস্থায় আমকে বিশেষ কাগজের ব্যাগে ঢেকে দেওয়ায় কীটনাশকের ব্যবহার কমে যায় এবং ফল থাকে দাগমুক্ত।

ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর MRL (Maximum Residue Limit)  শর্ত পূরণ করা সহজ হচ্ছে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের “ম্যাংগো ক্যালেন্ডার” অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের আগে আম পাড়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে অপরিপক্ব আম বাজারে যাওয়া কমেছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা বেড়েছে। বর্তমানে সাতক্ষীরার বহু বাগানে ফেরোমন ফাঁদ, জৈব সার ও নিরাপদ কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু বাগান ইতোমধ্যে GLOBALG.A.P  সনদও অর্জন করেছে।

বাংলাদেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় অঞ্চল :

সাতক্ষীরার পাশাপাশি দেশের আরও কয়েকটি অঞ্চল আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী : দেশের মোট আম উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি আসে এই অঞ্চল থেকে। হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি ও আশ্বিনা জাত আন্তর্জাতিক বাজারে বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

নওগাঁ : বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটিতে উৎপাদিত আমে চিনির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। নওগাঁর আম্রপালি ও নাক ফজলি ইউরোপীয় সুপারশপে জায়গা করে নিতে পারে।

পার্বত্য অঞ্চল : খাগড়াছড়ি ,রাঙামাটি ও বান্দরবান অঞ্চলে উৎপাদিত পাহাড়ি আমের রঙ ও স্বাদ আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে। জাপান, কোরিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে এগুলোর সম্ভাবনা রয়েছে।

রপ্তানির পথে প্রধান চ্যালেঞ্জ

সম্ভাবনা যত বড়, চ্যালেঞ্জও তত কম নয়। ঢাকা থেকে লন্ডনে প্রতি কেজি আম পাঠাতে খরচ হয় অত্যন্ত বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ে। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট ও প্যাকিং সুবিধা এখনও পর্যাপ্ত নয়। ফলে পরিবহনের সময় বিপুল পরিমাণ আম নষ্ট হয়। ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের জন্য এখঙইঅখএ.অ.চ, ঐঅঈঈচ ও ইজঈ সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের খুব কম সংখ্যক বাগান এখনও এসব সনদের আওতায় এসেছে। ভারতের “আলফানসো” কিংবা পাকিস্তানের “সিন্ধ্রি” আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত হলেও বাংলাদেশের “হিমসাগর” বা “ক্ষীরশাপাতি” এখনো বিশ্ববাজারে শক্ত ব্র্যান্ড পরিচিতি তৈরি করতে পারেনি। এছাড়াও ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের আমচাষ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে যা প্রয়োজন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আমকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত করতে সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন।

* সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় আন্তর্জাতিক মানের প্যাকিং হাউস স্থাপন
* ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট ও কোল্ড চেইন সম্প্রসারণ
* কৃষকদের এঅচ সনদপ্রাপ্তির সহায়তা
* কার্গো ভর্তুকি প্রদান
* “Bengal Mango” নামে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং
* প্রক্রিয়াজাত আমজাত পণ্য রপ্তানিতে বিনিয়োগ
* সমুদ্রপথে রপ্তানির জন্য রেফার কন্টেইনার ব্যবহার
*QR কোডভিত্তিক ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালু করা

আম শুধু ফল নয়, অর্থনীতির নতুন ভাষা। এক কেজি হিমসাগর যখন লন্ডনের সুপারশপে কয়েক পাউন্ড মূল্যে বিক্রি হয়, তখন সেটি কেবল একটি ফল নয়; সেখানে বিক্রি হয় বাংলাদেশের মাটি, কৃষকের ঘাম, উপকূলের রোদ এবং একটি সম্ভাবনাময় অর্থনীতির গল্প।

সাতক্ষীরা ইতোমধ্যেই পথ দেখিয়েছে। এখন সেই পথকে রাজশাহী থেকে নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত করার সময়। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে খুব শিগগিরই “বাংলাদেশি আম” বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাতে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পর আগামী অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নাম হয়তো হবেÑ“বাংলাদেশি আম”।

তথ্য ও উপাত্ত সহযোগিতা

এই প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে সহায়তা করেছে-

* Department of Agricultural Extension
* Bangladesh Agricultural Research Institute
* Export Promotion Bureau
* Bangladesh Agricultural Development Corporation
* সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
* স্থানীয় আমচাষি, রপ্তানিকারক ও কৃষি উদ্যোক্তাগণ
* আন্তর্জাতিক ফলবাজার ও কৃষি-বাণিজ্য বিষয়ক প্রকাশিত গবেষণা ও পরিসংখ্যান তথ্যসূত্র।

লেখক: সহ সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।

ডেল্টা টাইমস/রেহানা ফেরদৌসী/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ