সভ্যতার প্রধান উপাদান হলো শিক্ষা। যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত। কোনো জাতি ও সভ্যতার উত্থান-পতনের সঙ্গে শিক্ষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষার আলোয় মানুষ অন্ধকারকে জয় করে। অজ্ঞতার অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ পায়। মুক্তির পথের দিশা খুঁজে পায়। আলো-আঁধার, ভালো-মন্দ, নীতিনৈতিকতা ও ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে পরখ করার অন্যতম মাধ্যম হলো শিক্ষা। শিক্ষা মানবপ্রাণের লুক্কায়িত পশুত্বকে অবদমিত করে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। মানুষকে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অধিকারী করে তোলে। তাই শিক্ষাকে মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাই জাতীয় জীবনের অগ্রগতির মূলমন্ত্র হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে না। একটি শিশু যখন প্রথম অক্ষর শেখে, তখন সে কেবল ভাষা আয়ত্ত করে না-সে শেখে পৃথিবীকে বুঝতে, মানুষকে চিনতে, নিজের ভেতরে সম্ভাবনার আলো জ্বালাতে। সে কারণেই প্রাথমিক শিক্ষা কোনো সাধারণ শিক্ষাস্তর নয়, এটি একটি জাতির সভ্যতা নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর। আমাদের দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের স্কুলে ভর্তির সময় মেধা যাচাই বা ভর্তি পরীক্ষা কয়েক বছর বন্ধ ছিল। এই সিদ্ধান্তে অনেক অভিভাবক ও শিক্ষাবিদ স্বস্তি পেয়েছিলেন। কারণ ছোট শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমেছিল এবং ভর্তিপ্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি আবার এই পরীক্ষা চালুর আলোচনা সামনে আসায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, শিশুদের জন্য এই পরীক্ষা কতটা প্রয়োজন এবং এর প্রভাব তাদের মানসিক ও শিক্ষাগত বিকাশে কিভাবে প্রতিফলিত হয়?
একই সঙ্গে একটি বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে জীবনের পরবর্তী ধাপে অনেক ক্ষেত্রে মেধার পাশাপাশি কোটা, আঞ্চলিকতা বা অন্যান্য বিবেচনা গুরুত্ব পায়,অথচ শিক্ষা জীবনের শুরুতেই শিশুদের কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়। প্রাথমিক স্তরের শিশুরা শেখার একেবারে সূচনালগ্নে থাকে। এই সময় তাদের মনোজগৎ গড়ে ওঠে, কৌতূহল জন্মায়, ভাষা ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশ পেতে শুরু করে। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা যুক্ত হলে তা অনেক ক্ষেত্রেই এই বিকাশের গতিকে প্রভাবিত করে। অনেক শিশু পরীক্ষার পরিবেশে ভীত হয়, অস্বস্তি বোধ করে এবং নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে। এতে শেখার আনন্দ ক্ষুণ্ন হয়। শিক্ষা যদি শুরুতেই চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তা শিশুর মধ্যে শেখার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষার গুণগত মানকেও প্রভাবিত করে। শুধু তা-ই নয়, ছোট বয়সে এ ধরনের মানসিক চাপ শিশুদের আত্মবিশ্বাসে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বাস্তবতার একটি দিক উপেক্ষা করা যায় না। ভালো মানের স্কুলে আসনের তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে একটি বাছাই প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। কিন্তু এই বাছাই যদি শিশুদের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে তা কতটা যৌক্তিক, সেটি ভেবে দেখা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে আবাসিক এলাকা ভিত্তিক মানসম্মত স্কুলব্যবস্থা গড়ে তোলা একটি টেকসই সমাধান হতে পারে। যদি প্রতিটি এলাকায় সমমানের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে যাবে এবং ভর্তি নিয়ে অস্থিরতাও হ্রাস পাবে। আবাসিক এলাকা ভিত্তিক স্কুলব্যবস্থার গুরুত্ব এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানকে দূরের নামি স্কুলে ভর্তি করাতে চান। কারণ কাছাকাছি মানসম্মত প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় যাতায়াত করতে হয়, যা শিশুদের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর।
তাছাড়াও যানজটের কারণে সময় নষ্ট হয়, নিরাপত্তা- জনিত উদ্বেগ তৈরি হয় এবং পরিবারে অতিরিক্ত খরচ বাড়ে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে এই সমস্যা আরো প্রকট। যদি নিজ নিজ এলাকায় মানসম্মত স্কুল নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই সমস্যাগুলোর বড় অংশই কমে যাবে এবং শিশুদের দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ হবে। কাছাকাছি স্কুলে পড়াশোনা করলে অভিভাবকদের জন্য তদারকি সহজ হয়। তাঁরা সহজেই স্কুলে যেতে পারেন, শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন এবং সন্তানের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারেন। এতে শিক্ষা একটি যৌথ দায়িত্বে পরিণত হয়, যেখানে পরিবার ও স্কুল একসঙ্গে কাজ করে। এ ধরনের সমন্বয় শিশুদের শেখার পরিবেশকে আরো শক্তিশালী করে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। পাশাপাশি শিশুরাও নিজেদের পরিচিত পরিবেশে বেড়ে ওঠে, যা তাদের মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিছু স্কুলে সৃজনশীল পদ্ধতি, প্রকল্পভিত্তিক কাজ এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের চেষ্টা করা হলেও তা সীমিত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরীক্ষার নম্বরই প্রধান সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।এতে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং সামাজিক দক্ষতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে শিক্ষা অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়ে, যা আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট নয়। শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষার মান এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির এই পার্থক্য আরো গভীর সমস্যা তৈরি করে। শহরের কিছু প্রতিষ্ঠানে আধুনিক পদ্ধতি চালু থাকলেও গ্রামীণ এলাকার অনেক স্কুল এখনো প্রথাগত পরীক্ষানির্ভর ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতায় বৈষম্য তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে সুযোগের ক্ষেত্রেও পার্থক্য দেখা দেয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় এনে একটি সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা খুবই জরুরি।
শিশুদের ক্ষেত্রে মেধা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তা এককালীন পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যথেষ্ট নয়, বরং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি বোঝা বেশি কার্যকর। নিয়মিত ক্লাস পারফরম্যান্স, অংশগ্রহণ, সৃজনশীল কাজ এবং আচরণগত দিক বিবেচনায় নিলে একটি শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়।এই পদ্ধতি শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, তাদের শেখার আগ্রহ ধরে রাখে এবং প্রতিযোগিতার চাপ কমায়। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক যদি কেবল পাঠদান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়া বোঝার দিকে মনোযোগ দেন, তাহলে মূল্যায়ন আরো অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। সহানুভূতিশীল ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে উৎসাহ পায়। এতে শিক্ষা একটি আনন্দময়, মানবিক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টিকারী অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষানীতির একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শুধু অস্থায়ী সমাধান হিসেবে ভর্তি পরীক্ষা চালু করা সমস্যার মূল কারণ দূর করতে পারে না, বরং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি। প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং মানসম্মত পাঠ্যক্রম নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার গুণগত মান স্বাভাবিকভাবেই উন্নত হবে এবং ভর্তিকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা অনেকাংশে কমে যাবে।শিশুদের ভর্তির সময় মেধা যাচাই পুনরায় চালু করা একটি সহজ সমাধান মনে হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গভীর। এর পরিবর্তে যদি আবাসিক এলাকা ভিত্তিক মানসম্মত স্কুলব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়, তাহলে সেটিই হবে অধিক কার্যকর ও মানবিক পথ। এতে কিছু সময় ও বিনোয়োগ দরকার হবে, তবে স্থায়ী সমাধান মিলবে, নানামুখী সমস্যার সমাধান হবে। ফলস্বরূপ, শিশুদের মানসিক বিকাশ সুরক্ষিত থাকবে, পরিবারগুলোর মধ্যেও চাপ কমবে।
তাই বলছিলাম, যে শিক্ষায় মানবিকতা কিংবা নৈতিকতা থাকে না, সে শিক্ষা থেকে সমাজ রাষ্ট্র খুব বেশি উপকৃত হতে পারে না।একই সঙ্গে একজন শিশুর প্রথম শিক্ষালয় যেহেতু তার পরিবার এবং প্রথম শিক্ষক তার পিতামাতা সেক্ষেত্রে পরিবারকেও একজন শিক্ষার্থীর মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারেও সচেতন হতে হবে। প্রতিটি শিক্ষালয় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তি ও শিক্ষকদের এ ব্যাপারে কাযর্কর ভূমিকা নিতে হবে। এতে সমাজ ও দেশ হবে সমৃদ্ধশালী। মানুষ কেবলমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণীই নয়, তার একটি নৈতিক ও সামাজিক সত্তাও রয়েছে। সে সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করতে ভালোবাসে এবং সমাজ ও মানুষের প্রতি একটি দায়বদ্ধতাও সে অনুভব করে। এ কারণে মানব সন্তানকে তার নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্ম সম্পর্কেও জানতে হয় এবং নিজ সমাজ ও রাষ্ট্রের একজন আদর্শ, সৎ ও যোগ্য সদস্য ও নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার একটি তাড়নাও সে অনুভব করে। এভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে মানব শিশুকে যথার্থ মানুষ হয়ে উঠতে হলে তাকে অনেক কিছু জানতে ও বুঝতে হয় এবং নিজের ভবিষ্যত জীবনকে সুন্দর করার লক্ষে জীবনের একটি বিরাট সময় পর্যন্ত তাকে জ্ঞান অর্জন ও আত্মগঠনের কঠোর সাধনা ও অধ্যবসায়ে নিয়োজিত থাকতে হয়। বলাবাহুল্য, এই কঠোর অধ্যবসায় ও সাধনার মাধ্যমে সত্যিকার মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যেই মানব সত্তার শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার বিশেষত্ব ও সার্থকতা নিহিত।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।
ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই