পবিত্র ঈদুল-আযহাকে সামনে রেখে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠবে নৌপথ। ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সদরঘাট, চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন নদীবন্দর ও ফেরিঘাটে যাত্রীচাপ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিপুল যাত্রীচাপ সুষ্ঠুভাবে মোকাবিলা করে যাত্রীদের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। নৌপথে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণ নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, যাত্রীসেবা বৃদ্ধি, যানজট নিরসন, ঘাট ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঈদযাত্রাকে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং নৌযান মালিকদের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নদীবন্দর ও ফেরিঘাটগুলোতে বিশেষ নজরদারি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন রোধে কঠোর মনিটরিং এবং নৌযানের ফিটনেস যাচাই কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া ঘাট এলাকায় শৃঙ্খলা রক্ষা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যসেবা প্রদান এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সরকারের এসব উদ্যোগের মাধ্যমে এবারের ঈদযাত্রা আরও নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও জনবান্ধব হবে।
ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীর সদরঘাট এলাকায় অতিরিক্ত যানবাহন, যাত্রী ও মালামালের চাপের কারণে প্রতিবছরই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবার বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যানজট নিরসনে ঢাকার জিরোপয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়ককে আগামী ২১ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত যানজটমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সময় সড়কে এলোমেলোভাবে রাখা যানবাহন অপসারণ, অবৈধ পার্কিং বন্ধ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সড়ককে ওয়ানওয়ে হিসেবে পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শুধু ট্রাফিক পুলিশের ওপর নির্ভর না করে এবার আইনশৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আনসার সদস্য ও কমিউনিটি পুলিশকেও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি যাত্রীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সদরঘাট এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারি, মোবাইল টিম পরিচালনা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা হবে।
অতীতে বিভিন্ন সংস্থা পৃথক পৃথক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করায় সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যেত। এবার সেই সমস্যা সমাধানে সদরঘাটে একটি মাত্র “কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ” চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বিআইডব্লিউটিএ, নৌপরিবহন অধিদপ্তর, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, লঞ্চ মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধি থাকবেন। এখান থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং, জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মাঠপর্যায়ের সমন্বয় করা হবে। একই সঙ্গে পন্টুন, টার্মিনাল গেট ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গ্রুপ বা রোস্টারভিত্তিক মোবাইল ডিউটির ব্যবস্থাও থাকবে।
ঈদযাত্রায় নৌপথে ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং যাত্রী হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের নিয়মিত টহল জোরদার করা হবে, বিশেষ করে রাতের বেলায় টহল আরও বৃদ্ধি করা হবে। নদীপথে ঝুঁকিপূর্ণ বার্দিং, অর্থাৎ চলন্ত লঞ্চে নৌকা বা ট্রলার ভিড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণভাবে বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সদরঘাটের বিপরীত পাড় বা কেরানীগঞ্জ থেকে মাঝনদীতে যাত্রী তুলে লঞ্চে ওঠানোর প্রবণতাও বন্ধে নজরদারি বাড়ানো হবে।
ঈদযাত্রার সময় অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণ নৌপথে দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ঝুঁকি এড়াতে এবার কোনোভাবেই লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বা অতিরিক্ত মালামাল বহনের সুযোগ দেওয়া হবে না। পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে লঞ্চের ছাদে যাত্রী পরিবহণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে নৌপরিবহন অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কঠোর নজরদারি ও মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের কাছ থেকে অনুমোদিত ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের সব নদীবন্দর, টার্মিনাল, ঘাট ও লঞ্চে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টানিয়ে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে যাত্রীরা সহজেই নির্ধারিত ভাড়া সম্পর্কে জানতে পারেন এবং হয়রানির শিকার না হন।
আধুনিক যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি লঞ্চের প্রতিটি ফ্লোরে ডিজিটাল ডিসপ্লে স্ক্রিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব স্ক্রিনে লঞ্চের ভাড়া, যাত্রার সময়সূচি, নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং জরুরি হটলাইন নম্বর প্রদর্শন করা হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও জরুরি সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে নিম্নোক্ত হটলাইন নম্বরগুলো সর্বত্র দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—জাতীয় জরুরি সেবা: ৯৯৯, ফায়ার সার্ভিস: ১০২, বিআইডব্লিউটিএ হটলাইন: ১৬১১৩ এবং কোস্টগার্ড হটলাইন: ১৬১১১।
নদীবন্দর ও টার্মিনালগুলোতে যাত্রীসেবা উন্নয়নে এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশুদ্ধ পানি, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, মোবাইল চার্জিং সুবিধা, নারীদের জন্য ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার, শিশু ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধ যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ার সেবা চালু রাখা হবে। প্রশিক্ষণার্থী ক্যাডেটদের মাধ্যমে এসব সেবা ব্যবস্থাপনা পরিচালনার কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া যাত্রীদের লাগেজ বহনের সুবিধার্থে পর্যাপ্ত ট্রলি সংগ্রহ ও পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঈদযাত্রায় ঘাট ও লঞ্চ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা নিয়েও বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সদরঘাটসহ বিভিন্ন নদীবন্দরে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোরবানির পশুর হাট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘাটসংলগ্ন এলাকায় পশুর হাট বসতে না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোরবানির বর্জ্য যাতে নদীতে পড়ে পানি দূষণের কারণ না হয়, সেজন্য সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধে উদ্ধারকারী নৌযান প্রস্তুত রাখা, আবহাওয়া সংকেত মেনে নৌযান পরিচালনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আবহাওয়ায় সতর্কতা বৃদ্ধির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে প্রস্তুত রাখা হবে। প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরে ভাসমান নৌ-ফায়ার স্টেশন স্থাপন করা হবে। চাঁদপুরের মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় ঘূর্ণাবর্ত এলাকা মার্কিংসহ বিভিন্ন নৌরুটে নাব্য চ্যানেল চিহ্নিত করার কাজও জোরদার করা হবে।
ঈদযাত্রায় ফেরিঘাটগুলোতেও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়। এ কারণে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ফেরি সচল রাখা, পার্কিং ইয়ার্ড প্রস্তুত রাখা এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কন্ট্রোল গেট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঈদের আগে ও পরে নির্দিষ্ট কয়েকদিন সাধারণ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ফেরিতে পারাপার বন্ধ রাখা হবে। শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় ও দ্রুত পচনশীল পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করতে পারবে। এ ছাড়া বাস ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়েছে।
সদরঘাটের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে বিকল্প নৌপথ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বসিলা ঘাট ও পূর্বাচলের শিমুলিয়া ঘাট থেকে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি যাত্রীদের সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিআরটিসির ফিডার বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে লঞ্চঘাট ও ফেরিঘাটে পৌঁছাতে পারেন। নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যাপক প্রস্তুতির পাশাপাশি যাত্রীদের সচেতনতা এবং নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবার সম্মিলিত সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে এবারের ঈদযাত্রা হবে আরও নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও স্বস্তিদায়ক। নৌপথে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার, অতিরিক্ত ভিড় এড়িয়ে চলা, নির্ধারিত ভাড়া প্রদান এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কোনো ধরনের অনিয়ম, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি চোখে পড়লে দ্রুত সংশ্লিষ্ট হটলাইনে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এবারের নৌপথের ঈদযাত্রা আরও মানবিক, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
লেখক: তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়,
বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা। পিআইডি ফিচার
ডেল্টা টাইমস্/কাজী আরিফ বিল্লাহ/আইইউ