প্রকাশ: শনিবার, ২ মে, ২০২৬, ৭:৫৮ পিএম (ভিজিট : ১৪৫)

সংগৃহীত ছবি
উপকূলের জেলেদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, নদীতে মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় নদীনির্ভর জেলেরা মারাত্মক জীবিকা সংকটে পড়েছেন। ফলে নিজস্ব ছোট নৌকা ও জালের মালিক অনেকে বাধ্য হয়ে সাগরে মাছ ধরা ট্রলারের শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। সেখানে পুরো ব্যবস্থাই নিয়ন্ত্রণ করেন ট্রলার মালিক, জালের মালিক ও আড়ৎদাররা; জেলে সেখানে কেবলই একজন শ্রমিক।
শনিবার (২ মে) বরগুনা সদর উপজেলার লতাকাটা খেয়াঘাটে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এবং সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র। ‘অবৈধ জাল বন্ধ কর, মৎস্যসম্পদ রক্ষা কর’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের শিক্ষক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন সচেতন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সাকিলা পারভীন, সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী মুশফিক আরিফ, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. আব্দুল জব্বার, পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমান, নাগরিক নেতা সুলতান হাওলাদার, জেলে সমিতির নেতা মো. মিজানুর রহমান ও ইয়াসিন আলীসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
মূল প্রবন্ধে মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশের নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও উপকূলীয় জলাশয় জাতীয় মৎস্যসম্পদের প্রধান উৎস। দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি এ খাত জাতীয় প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ সরবরাহ করে এবং জিডিপিতে ১.৫৩ শতাংশ ও কৃষিজ জিডিপিতে ২২.২৬ শতাংশ অবদান রাখে। তবে কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি, বেহুন্দি, খুঁটা ও মশারি জালের মতো অবৈধ জালের অবাধ ব্যবহার বাড়ায় পোনা ও মা মাছ ধ্বংস হচ্ছে, প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে এবং জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধের ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৭ লাখ জেলে সরাসরি এবং প্রায় ২৫ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে ইলিশের ওপর নির্ভরশীল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ৭.৩৩ শতাংশ কমেছে, যার একটি প্রধান কারণ অবৈধ জালের ব্যবহার। এসব জালের কারণে ডিম ছাড়তে আসা মা ইলিশ নদীতে আটকা পড়ে এবং প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। প্রশাসনিক অভিযান থাকলেও বাস্তবে অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, সরকারি নানা উদ্যোগ থাকলেও জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া তা কার্যকর হয় না। জেলেদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় বাজেটে এ খাতে বিশেষ বরাদ্দ রাখা জরুরি, যাতে জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও নদ-নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।
সংলাপে ১০ দফা সুপারিশ উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, জেলেদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি, কঠোর আইন প্রয়োগ ও নজরদারি জোরদার, জাল উৎপাদন ও বিক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি, উপজেলা পর্যায়ে নদী ও মৎস্য রক্ষা কমিটি গঠন, সরকার ও নাগরিক সমাজের যৌথ উদ্যোগ এবং অবৈধ জালবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা।
ডেল্টা টাইমস্/সিআর/আইইউ