প্রকাশ: শনিবার, ২ মে, ২০২৬, ২:৫০ পিএম (ভিজিট : ৭৪)

সংগৃহীত ছবি
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর ছোট যমুনা নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। একসময় এলাকার প্রাণ হিসেবে পরিচিত নদীটি আজ পানিশূন্য হয়ে অনেকটা মরা খালে পরিণত হয়েছে। তার ওপর পৌর বাজারের নিত্যদিনের ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলায় সৃষ্টি হয়েছে বিশাল আবর্জনার স্তূপ। এতে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুলবাড়ী পৌরসভার কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় পৌর বাজার ও আশপাশের এলাকার ময়লা-আবর্জনা নিয়মিতভাবে ছোট যমুনা নদীর ফুটব্রিজের নিচসহ নদীর বিভিন্ন স্থানে ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে পৌরশহরের ফুটব্রিজের নিচে এবং জোড়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন আবর্জনা ফেলছেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। ফলে নদীর তলদেশ ভরে উঠছে বর্জ্যের স্তূপে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফুলবাড়ী-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর বিভিন্ন অংশে প্লাস্টিক, পচা সবজি, গৃহস্থালি বর্জ্যসহ নানা ধরনের ময়লা জমে আছে। এতে করে নদীর পূর্বপ্রান্ত এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে উঠেছে। দুর্গন্ধে পথচারীদের চলাচলও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগেও অল্প পরিমাণ বর্জ্য ফেলা হলেও বর্তমানে পৌরসভার অধিকাংশ ময়লাই এখানে ফেলা হচ্ছে। গৃহস্থালি বর্জ্যর পাশাপাশি কাঁচাবাজারের ময়লা-আবর্জনাও নিয়মিত নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে জলজ পরিবেশ।
এলাকার প্রবীণদের ভাষ্যমতে, ৮০ দশকেও ছোট যমুনা ছিল প্রাণবন্ত নদী। বর্ষায় নদী পানিতে টইটম্বুর থাকত, আর শুষ্ক মৌসুমেও চলত নৌকা। নদীপথে বিভিন্ন এলাকায় পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্য হতো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে নাব্যতা কমে যাওয়া, পলি জমা, অবৈধ দখল ও অব্যবস্থাপনায় নদীটি ক্রমেই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে গেছে। এতে নদীটি দিন দিন সরু হয়ে যাচ্ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, নদী শুধু পানির উৎস নয়; এটি একটি অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ছোট যমুনা নদীকে বাঁচাতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় অব্যাহত দূষণ ও দখল চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ছোট যমুনা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে।
ফুলবাড়ী সম্মিলিত সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি হামিদুল হক বলেন, দ্রুত নদী খননের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাবে না।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাশেদা আক্তার বলেন, দেশের মিঠাপানির জলাশয়ে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪ প্রজাতি বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া এবং পানি দূষণ এসবের অন্যতম কারণ। নদী-নালা ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলার কারণে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। এতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজননও ব্যাহত হচ্ছে।
তবে ফুলবাড়ী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লুৎফুল হুদা চৌধুরী দাবি করেন, পৌরসভা থেকে নদীতে কোনো বর্জ্য ফেলা হচ্ছে না। তিনি জানান, জাইকা প্রকল্পের মাধ্যমে পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় বরাদ্দ ফেরত গেছে।
এদিকে ফুলবাড়ী পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামিউল ইসলাম বলেন, নদীতে পৌরসভার বর্জ্য ফেলার বিষয়টি তার জানা নেই। অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বলেন, নদী দূষণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ছোট যমুনা নদী রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ফুলবাড়ী পৌরসভাকে অবহিত করা হবে।
ডেল্টা টাইমস্/আনোয়ার সাদাত/আইইউ