
প্রতীকী ছবি
মুমিনের জীবনের সৌন্দর্য শুধু তার ইবাদতে নয়, বরং তার চরিত্র ও আচরণে ফুটে ওঠে। সেই চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলংকার হলো—বিনয় ও নম্রতা। অহংকার মানুষের হৃদয়কে কঠিন করে তোলে, আর বিনয় সেই হৃদয়কে করে তোলে কোমল, আলোকিত ও আল্লাহভীরু। তাইতো আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিবকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আপনি আপনার মুমিন অনুসারীদের সামনে নিজ ডানা বিনীত করে দিন।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ২১৫)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত মুমিনদের গুণাবলি কেমন হবে, সেটা উল্লেখ করে বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরে আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালোবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনীত-নম্র হবে এবং কাফিরদের প্রতি হবে কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন।
আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৫৪)
বিনয় এমন একটি গুণ, যা মানুষকে মানুষের কাছে প্রিয় করে তোলে এবং আল্লাহর নিকটও করে সম্মানিত। প্রক্ষান্তরে, অহমিকা ও আত্মপ্রশংসা মানুষকে নিন্দিত করে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আত্মপ্রশংসা কোরো না। তিনি ভালো জানেন কে মুত্তাকি।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩২)
একজন সত্যিকারের মুমিন কখনো নিজেকে বড় মনে করে না; বরং সে সবসময় নিজেকে আল্লাহর একজন ক্ষুদ্র বান্দা হিসেবে অনুভব করে এবং মানুষের সাথে আচরণে প্রদর্শন করে নম্রতা, সহনশীলতা ও সৌজন্য। ইয়াজ ইবনু হিমার (রা.)-থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আমার কাছে ওহি প্রেরণ করেছেন যে, তোমরা যেন পরস্পরে বিনয়ী হও। আর যেন কেউ কারও প্রতি অহংকার ও গর্ব না করে এবং জুলুম না করে বসে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৭২১০)
বিনয় ও নম্রতা মুমিনের জীবনে শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়; বরং এটি ঈমানের পরিপূর্ণতার একটি অপরিহার্য অংশ। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সাদাকাহর মাধ্যমে সম্পদ কমে যায় না। আর কেউ ক্ষমা করলে, আল্লাহ তাআলা তার সম্মান বৃদ্ধি করে দেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে (তার মর্যাদা উঁচু করে দেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ৯০০৮)
ইতিহাস সাক্ষী, সব নবী-রাসুল ও সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন বিনয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি (একবার) কয়েকজন শিশুর পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে তাদের সালাম দিলেন এবং বললেন, প্রিয় নবিজি (সা.) এমনই করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬২৪৭)
কেননা, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদার উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেন।
এমনকি মহানবী (সা.) ঘরের বিভিন্ন কাজ করতেন। পরিবারকে তিনি সহযোগিতা করতেন। জুতো সেলাই করতেন, জামায় তালি লাগাতেন, দুধ দোহাতেন। আরও বিভিন্ন কাজ তিনি করতেন। ইরশাদ হয়েছে, আসওয়াদ ইবনু ইয়াযিদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়শা (রা.)-কে প্রশ্ন করলাম, নবিজি (সা.) ঘরে কী কী কাজ করতেন? তিনি বললেন, ঘরের কাজই করতেন। অর্থাৎ স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করতেন। আর যখনই সালাতের সময় হয়ে যেত, তিনি সালাতের জন্য বের হয়ে যেতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৭৬)
একজন মুমিনের উচিত নিজের চরিত্রকে বিনয় ও নম্রতায় গড়ে তোলা—কথা, কাজ ও আচরণের প্রতিটি ক্ষেত্রে। এমনকি খাবারের সময়ও। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খাবার গ্রহণকালে নবিজি (সা.) তিন আঙুল চেটে খেতেন এবং বলতেন, তোমাদের কারও খাবারের লুকমা (গ্রাস) পড়ে গেলে সে যেন তা তুলে পরিষ্কার করে খায়: শাইতানের জন্য রেখে না দেয়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্লেট উত্তমভাবে চেটে খাওয়ার আদেশ দিতেন এবং বলতেন, তোমরা পাত্র ভালোভাবে চেটে খাও। কেননা তোমাদের জানা নেই যে, খাবারের পাত্রে কোথায় বারাকাহ গচ্ছিত আছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৫৩০৬)
অতএব, বিনয় ও নম্রতা মুমিনের জীবনের এমন এক অমূল্য গুণ, যা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার পথে পরিচালিত করে। এটি মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করে, শত্রুকেও বন্ধুতে পরিণত করে এবং সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করে। অহংকার যেখানে পতনের কারণ, সেখানে বিনয় উন্নতির সোপান। তাই আসুন, আমরা সবাই বিনয়কে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে প্রকৃত মুমিন হওয়ার চেষ্টা করি।
ডেল্টা টাইমস্/আইইউ