বিএনপি-আ.লীগসহ ১০ দলে পরিবারতন্ত্র, সিদ্ধান্ত ও মনোনয়নে একক আধিপত্য

ডেল্টা টাইমস ডেস্ক:

জাতীয়

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চায় চরম সংকট দেখা গেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এবং বিগত ক্ষমতাসীন দল

2026-11-01T12:10:53+06:00
2026-11-01T12:19:32+06:00
রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন
বিএনপি-আ.লীগসহ ১০ দলে পরিবারতন্ত্র, সিদ্ধান্ত ও মনোনয়নে একক আধিপত্য
ডেল্টা টাইমস ডেস্ক:
প্রকাশ: রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:১০ পিএম  আপডেট: ০১.১১.২০২৬ ১২:১৯ পিএম  (ভিজিট : ১৯)

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চায় চরম সংকট দেখা গেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এবং বিগত ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ অধিকাংশ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণ ও প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া ব্যক্তিনির্ভর এবং পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

রোববার (১ নভেম্বর) সকাল ১১টায় রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির মেঘমালা সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ গবেষণা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এতে উপস্থিত থেকে প্রতিবেদনের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

১০ দলে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের পর্যালোচিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ১০টিতে পরিবারকেন্দ্রিক দলীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই দলগুলোর মধ্যে রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা এবং বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি।

ব্যক্তিনির্ভরতা ও দীর্ঘমেয়াদে শীর্ষ পদ আঁকড়ে রাখার প্রবণতা

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের বহু রাজনৈতিক দলের সামগ্রিক অস্তিত্ব শীর্ষ নেতার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে শীর্ষ নেতা পরিবর্তিত হলে দল ভেঙে যাবে কিংবা দল রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে- এমন আশঙ্কায় একই ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে দলের শীর্ষ পদ ধরে রাখছেন। 

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৩২টি দলের নেতৃত্ব প্রদানের সময়কাল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১২টি রাজনৈতিক দলের প্রধান ১০ বছর বা তার অধিক সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। দলীয় প্রধানের সময়কালের হিসাবে ২০টি দলের প্রধানের নেতৃত্ব প্রদানের মেয়াদ ১০ বছরের কম, ৫টি দলের মেয়াদ ১০ থেকে ২০ বছর এবং ৭টি দলের প্রধান ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নেতৃত্বে রয়েছেন। 

শীর্ষ নেতাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান ৪৫ বছর এবং বিএনপির দলীয় প্রধান ৪১ বছর ধরে দায়িত্বে ছিলেন, তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির দলীয় প্রধান পদে পরিবর্তন এসেছে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৃণমূল উপেক্ষিত ও ১৮ দলে অনিয়মিত কাউন্সিল

রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে জাতীয় কাউন্সিল, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি ও উপ-কমিটির মতো কাঠামোগত ব্যবস্থার কথা বলা হলেও কার্যত অধিকাংশ দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যক্তিনির্ভর। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় কাউন্সিল বা কনভেনশনকে দলের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ফোরাম হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ১৮টি দলের কাউন্সিল সভা নিয়মিত হয় না। তাছাড়া যেসব কাউন্সিল সভা অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে মূলত আগে থেকে নির্ধারিত সিদ্ধান্তের কেবল আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়। 

একই সঙ্গে তৃণমূলের জেলা, উপজেলা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলোকে কেবল কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, নির্বাচনি প্রচারণা ও সাংগঠনিক বিস্তারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। দলগুলোর সামগ্রিক নীতি বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের মতামতের সুযোগ একেবারেই সীমিত। 

কমিটি গঠনে অস্বচ্ছতা ও নির্দিষ্ট মেয়াদের অনুপস্থিতি

দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন- এই তিনটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দিষ্ট মেয়াদের কথা দলীয় গঠনতন্ত্রে উল্লেখ নেই। এর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের গঠনতন্ত্রে কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার কোনো সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে নাগরিক ঐক্য ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের স্থানীয় কমিটির মেয়াদ সম্পর্কে তাদের গঠনতন্ত্রে কোনো বিধান নেই এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটি স্থানীয় কমিটি গঠনের নিয়মাবলি নির্ধারণ করে। এছাড়া স্থানীয় কমিটিগুলোতেও একই ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্ব দেওয়ার চর্চা বিদ্যমান রয়েছে।

মনোনয়নে আরপিও লঙ্ঘন ও পেশিশক্তির আধিপত্য

নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় আইনি নির্দেশনার ব্যাপক ব্যত্যয় চিহ্নিত করেছে টিআইবি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সংসদীয় বোর্ড কর্তৃক দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার সময় সংশ্লিষ্ট সংসদীয় এলাকার স্থানীয় পর্যায়ের কমিটির প্রস্তাবিত প্যানেল বিবেচনা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ দলই এটি মানছে না; বরং সরাসরি মনোনয়ন বোর্ডের সাক্ষাৎকার ও আলোচনার ভিত্তিতে প্রার্থী ঠিক করা হয়, যেখানে দলীয় প্রধানের মতামতকেই সর্বাধিক প্রাধান্য দেওয়া হয়।

অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে দলীয় প্রার্থী হওয়ার সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও অযোগ্যতার সুস্পষ্ট শর্ত রাখা হয়নি। মাত্র ছয়টি দলের গঠনতন্ত্রে যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, সততা ও দলের প্রতি আনুগত্যের কথা বলা হলেও সেগুলো স্পষ্ট নয়। মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রার্থীর নিজস্ব জনপ্রিয়তার পাশাপাশি দলীয় প্রধানের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে বৃহৎ বা প্রভাবশালী দলগুলোতে আর্থিক সামর্থ্য এবং পেশিশক্তিকে প্রার্থী মনোনয়নের অন্যতম প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। 

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৩ সালে আরপিও থেকে দলীয় প্রার্থী হতে হলে ন্যূনতম তিন বছর সংশ্লিষ্ট দলে সক্রিয় সদস্য থাকার শর্তটি বাতিল করা হয়েছিল, যা এখনো বহাল রয়েছে।


ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ