ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, গ্রেপ্তার হাজারের বেশি

ডেল্টা টাইমস ডেস্ক:

আন্তর্জাতিক

ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা

2026-10-18T11:53:57+06:00
2026-10-18T11:53:57+06:00
রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, গ্রেপ্তার হাজারের বেশি
ডেল্টা টাইমস ডেস্ক:
প্রকাশ: রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৩ এএম   (ভিজিট : ৯)
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ। ছবি: এএফপি

পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ। ছবি: এএফপি

ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শনিবারের এসব ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন আনুমানিক ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অন্তত ১৫০ জন পুলিশ সদস্য।

ফরাসি সরকার চলমান পরিস্থিতিকে ‘সহিংসতার ভয়াবহ বিস্তার’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে সরকারি ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনে হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিসে বিকেলে বিক্ষোভের মূল মিছিল অনেকটা শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। একপর্যায়ে মধ্য প্যারিসে পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের দিকে এগিয়ে গিয়ে লাঠিপেটা করতেও দেখা যায়।

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে আগুন জ্বালানো এবং গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকাতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। বেশ কয়েকটি দোকানে লুটপাট চালানো হয়। অন্তত একটি রেস্তোরাঁ আগুনে পুড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

লিয়ঁ ও লিমোজে সরকারি ভবনে আগুন

ফ্রান্সের লিয়ঁ শহরে পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে ‘শহরের জন্য একটি ট্র্যাজেডি’ বলে অভিহিত করেছেন মেয়র গ্রেগরি দুসে। বিএফএমটিভিকে তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ও সুপরিচিত ভবনটি পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় তারা মর্মাহত।

স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, ‘শত্রুভাবাপন্ন ব্যক্তিরা’ দমকলকর্মীদের নিরাপদে আগুন নেভানোর কাজে বাধা দেন। অন্যদিকে, লিমোজ শহরের পৌরসভা ভবনেও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ভবনটির ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সাঁত এতিয়েন শহরে গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক তরুণের হাত উড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন শহরটির মেয়র রেজিস জুয়ানিকো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘এমন মর্মান্তিক ঘটনা কখনোই ঘটা উচিত নয়।’

বিভিন্ন শহরে লুটপাট ও ভাঙচুর

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজধানী প্যারিসসহ মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঞ্জে শহরের বিভিন্ন স্থানে মুখোশধারী ব্যক্তিরা পরিকল্পিতভাবে সহিংস কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন।

এ ছাড়া গ্রেনোবল, আভিনিয়োঁ, পো, মন্টপেলিয়ের ও ভ্যালঁস শহরেও বিভিন্ন ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্যারিসে পোশাক ও খাবারের দোকানে লুটপাট চালানো হয়। লিল শহরে একটি অ্যাপল স্টোরে ভাঙচুর করে সেখানকার পণ্য লুট করা হয়েছে।

বিবিসি ভেরিফাইয়ের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, গ্রেনোবল শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি সরু সড়ক দিয়ে মুখোশধারী কয়েকজন ব্যক্তি পর্যটকদের ব্যবহৃত একটি ট্রেন চালিয়ে অন্তত তিনজন দাঙ্গা পুলিশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বলেছেন, বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশকে অত্যন্ত তীব্র সহিংসতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু গোষ্ঠী আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি হিসেবে এই বিক্ষোভকে ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, ‘কেউ সহিংসতার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি চাপিয়ে দিতে পারবে না।’

শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে আসছেন। দেশটিতে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের পড়াশোনার প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত লিসে স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত কর্মী ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব নিয়ে তাঁদের অভিযোগ।

শনিবারের বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য এবং অন্যান্য প্রতিবাদী গোষ্ঠী। তাদের মধ্যে রয়েছে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরাও। ২০১৮ সাল থেকে এক বছরের বেশি সময় ধরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন করে আলোচনায় এসেছিল এই গোষ্ঠী। ফ্রান্সের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদ আন্দোলনগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এটি।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গত ৮ অক্টোবর টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার গেফ্রে ৩ হাজার অতিরিক্ত অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে তাতেও বিক্ষোভ থামেনি; বরং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বাড়ছে উত্তেজনা


ফ্রান্সে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। তবে এবার দেশটি গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আগামী বছর প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। জনমত জরিপের ইঙ্গিত অনুযায়ী, আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ন্যাশনাল র‍্যালির নেতা মারিন লে পেন এবং কট্টর বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশঁর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিতে পারে।

মেলঁশঁ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘ঝাঁপিয়ে পড়ার’ অভিযোগ তোলেন। তবে একই সঙ্গে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের নিন্দাও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু মেলঁশঁর বক্তব্যকে ‘বিপজ্জনক ও কপট’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে, লে পেন অভিযোগ করেছেন, বিক্ষোভকারীদের ন্যায্য দাবিগুলোকে কট্টর বামপন্থীরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্যও তিনি মেলঁশঁকে দায়ী করেন।

প্রেসিডেন্ট মাখোঁ বলেছেন, যাঁরা সরকারি প্রশাসনিক কার্যালয় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছেন কিংবা পৌরসভা ভবনে লুটপাট করেছেন, তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ এবং অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষা খাতের সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।


ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ