শিশু ও কিশোরদের স্থূলতা রোধে ওজন কমানোর ওষুধের বদলে স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড ও কাউন্সেলিংয়ে জোর দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। স্থূলতা নিয়ে বুধবার (৭ অক্টোবর) প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর প্রথম বৈশ্বিক নির্দেশিকায় এ সুপারিশ করা হয়েছে।
শিশু ও কিশোরদের স্থূলতা মোকাবিলায় প্রথমবারের মতো নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে ডব্লিউএইচও। এতে বয়সভেদে স্থূলতার চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়।
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ১০ বছরের কম বয়সের শিশুদের স্থূলতার চিকিৎসায় ওজন কমানোর ওষুধ, পাকস্থলীতে অস্ত্রোপচার বা ওজন কমানোর কোনো যন্ত্র যেন ব্যবহার করা না হয়। তবে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জীবনযাত্রা পরিবর্তনের কর্মসূচিতে কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে অনুমোদিত ওষুধ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। গুরুতর স্থূলতার সঙ্গে স্বাস্থ্যগত জটিলতা থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে ব্যারিয়াট্রিক সার্জারিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে স্থূলতাডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৫ থেকে ৯ বছরের প্রায় সাত কোটি শিশু স্থূলতায় ভুগছিল। একই সময়ে ১০ থেকে ১৯ বছরের প্রায় ১০ কোটি কিশোর-কিশোরী স্থূলতায় ভুগছিল। ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে স্থূলতার হারও গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১৯৯০ সালে এদের মধ্যে স্থূলতার হার ছিল প্রায় ২ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ডব্লিউএইচওর পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক লুজ মারিয়া দে রেজিল বলেন, বিশ্বের সব অঞ্চলেই শিশু-কিশোরদের স্থূলতার হার বাড়ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এ প্রবণতা বেশি। তাঁর মতে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্থূলতার চিকিৎসার ভিত্তি ওষুধ বা অস্ত্রোপচার নয়। স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক আচরণগত পরিবর্তনের সুযোগ নিশ্চিত করাই এর মূল ভিত্তি।
শুধু ওজন নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজরস্থূলতার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে ডব্লিউএইচও। সংস্থাটি জানিয়েছে, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও আত্মসম্মানবোধ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। স্থূলতায় আক্রান্ত শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা সামাজিক কটূক্তি, বৈষম্য ও বুলিংয়েরও শিকার হতে পারে। তাই স্থূলতার চিকিৎসায় শুধু ওজন কমানোর বিষয় নয়; শিশুর মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গুরুতর স্থূলতায় অস্ত্রোপচারের সুযোগডব্লিউএইচওর পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিভাগের বিজ্ঞানী মারিয়া নিভেস গার্সিয়া কাসাল বলেন, কিশোর বয়সে গুরুতর স্থূলতার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো জটিলতা দেখা দিলে ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে অস্ত্রোপচারের আগে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থূলতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে। এসব পদক্ষেপে কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে এবং গুরুতর স্থূলতার সঙ্গে স্বাস্থ্যগত জটিলতা থাকলে অস্ত্রোপচারের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নীতি ভিন্নশিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য ডব্লিউএইচওর এই নির্দেশনা প্রাপ্তবয়স্কদের স্থূলতা চিকিৎসায় সংস্থাটির সাম্প্রতিক অবস্থানের তুলনায় ভিন্ন। প্রাপ্তবয়স্কদের স্থূলতা চিকিৎসায় জিএলপি-ওয়ান অ্যাগোনিস্ট শ্রেণির ওষুধের ভূমিকা বিবেচনা করেছে ডব্লিউএইচও। ওজেম্পিক ও মাউনজারোর মতো পরিচিত ব্র্যান্ড এ শ্রেণির ওষুধের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে ওষুধনির্ভর চিকিৎসার বদলে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি আচরণগত পরিবর্তনকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশেও বাড়ছে অতিরিক্ত ওজনের প্রবণতাবাংলাদেশে একদিকে অপুষ্টি এখনও শিশুস্বাস্থ্যের বড় হুমকি, অন্যদিকে শহরাঞ্চলে শিশু-কিশোরদের অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার প্রবণতা বাড়ছে। গত এপ্রিলে ইউনিসেফের ‘ফিডিং প্রফিট: হাউ ফুড এনভায়রনমেন্টস আর ফেইলিং চিলড্রেন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিশুদের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি পরিস্থিতির এমন চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৮ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছে। আগে তুলনামূলকভাবে উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বেশি দেখা গেলেও এখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুদের মধ্যেও এ প্রবণতা বাড়ছে। ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড, মিষ্টি বিস্কুট ও কোমল পানীয়র মতো প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতা এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, পুষ্টির অভাবে দেশের গ্রামীণ অঞ্চলের প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতিতে ভুগছে। ফলে বাংলাদেশে অপুষ্টির ডাবল বার্ডেন বা দ্বৈত বোঝা স্পষ্ট হয়ে উঠছে– একদিকে অপুষ্টি, অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা।
শিশুর খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতিপ্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। স্কুল পরিবেশে ফাস্টফুড ও চিনিযুক্ত পানীয়র সহজলভ্যতাও কিশোর-কিশোরীদের ওজন বাড়ার অন্যতম কারণ। ৬ থেকে ২৩ মাসের শিশুদের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবারের বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রায় ৩৮ শতাংশ শিশু ডিম ও মাংস খেতে পায় না। ৪৬ শতাংশ শিশু শাকসবজি ও ফল খায় না। বিপরীতে ৫৯ শতাংশ শিশু নিয়মিত নিম্নমানের খাবার ও কোমল পানীয় গ্রহণ করে। প্রায় ২০ শতাংশ শিশু লবণাক্ত ও ভাজা খাবার খায়। বিশ্বজুড়েও স্কুলগামী শিশু-কিশোরদের মধ্যে স্থূলতা বাড়াকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিশুদের ওজন বাড়লেও তাদের পুষ্টির ঘাটতি থেকে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেই এ ধরনের স্থূলতার হার সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে।
চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় নিয়ে উদ্বেগপ্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুদের মধ্যে ২০ জনে একজন, অর্থাৎ প্রায় ৫ শতাংশ অতিরিক্ত ওজনের শিকার। ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু ও কিশোরদের মধ্যে প্রায় পাঁচজনে একজন বা ২০ শতাংশ বাড়তি ওজনে ভুগছে। ২০০০ সালে বিশ্বে ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী অতিরিক্ত ওজনের শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৯ কোটি ৪০ লাখ। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩৯ কোটি ১০ লাখে দাঁড়িয়েছে।
নতুন সূচক অনুযায়ী, ৬ থেকে ২৩ মাসের অনেক শিশুই নিয়মিত মিষ্টি ও ভাজা খাবার খাচ্ছে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ প্রতিদিন একাধিক চিনিযুক্ত খাবার বা পানীয় গ্রহণ করে। এ বয়সীদের প্রায় ৩২ শতাংশ কোমল পানীয় এবং ২৫ শতাংশ নোনতা প্রক্রিয়াজাত খাবার খায়।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই