
রাজধানীর নভোথিয়েটারে আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য উদ্ভাবন সবার জন্য’ শীর্ষক সেমিনারে ডা. জুবাইদা রহমান।
দেশের দূরবর্তী গ্রামসহ প্রতিটি অঞ্চলের নাগরিকের কাছে সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের ৯০ হাজারের বেশি গ্রামের প্রতিটি মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চায় সরকার।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নভোথিয়েটারে আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য উদ্ভাবন সবার জন্য’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য যেন দূর-দূরান্তে যেতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে হামে আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকেরাও যেন বাড়ির কাছেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পান, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তিনি ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার এবং হাম প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচিতে সবাইকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান।
হৃদরোগ ও ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্ব
বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধি ও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ উল্লেখ করে জুবাইদা রহমান বলেন, উন্নত চিকিৎসার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। তিনি ক্যান্সার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞ থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপরও দেশের অনেক মানুষ নিজেদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি না জেনেই জীবনযাপন করছেন।
তার মতে, শুধু স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা করলেই হবে না। পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত ব্যক্তিকে নিশ্চিত রোগ নির্ণয়, পরামর্শ, চিকিৎসা, ওষুধ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রেফারেল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব
জুবাইদা রহমান বলেন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা মানুষের আয়, অবস্থান কিংবা সামাজিক মর্যাদার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের প্রতিটি নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য হওয়া প্রয়োজন।
তার প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য রূপকল্পের মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, মানুষের ঘরের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি এবং পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়িয়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করা।
বিশেষভাবে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, এ উদ্যোগ নারীদের জন্যও কর্মসংস্থানের বিশেষ সুযোগ তৈরি করবে।
এই স্বাস্থ্যকর্মীরা স্ক্রিনিং, মা ও শিশুস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যশিক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে রোগী রেফারেলের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
মা ও নবজাতকের জন্য উন্নত সেবা প্রয়োজন
গর্ভাবস্থার শেষ দিকে কিংবা প্রি-এক্ল্যাম্পশিয়ার মতো জটিলতার ক্ষেত্রে অনেক নারী পর্যাপ্ত পরিবহনসুবিধার অভাবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন বলে উল্লেখ করেন জুবাইদা রহমান।
তিনি বলেন, সময়ের আগে জন্ম নেওয়া নবজাতকদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়। কমিউনিটি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগী স্থানান্তরের ব্যবস্থা আরও মসৃণ করতে হবে।
চিকিৎসা শেষে রোগী যেন স্বাস্থ্যব্যবস্থার নজরদারি থেকে হারিয়ে না যান, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, হাসপাতাল থেকে রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য আবার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দলের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন।
রক্ত ব্যবস্থাপনায় জাতীয় সমন্বিত ব্যবস্থা চাইলেন
দেশে রক্তের ব্যবস্থাপনায় একটি জাতীয় সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন জুবাইদা রহমান। তিনি বলেন, এই ব্যবস্থার মধ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদান, নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ, সংক্রামক রোগের পরীক্ষা, রক্তের উপাদান পৃথকীকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং রক্তদাতা থেকে রোগী পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকা উচিত। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে প্লাজমা পরিবহনের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকেও এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
উদ্ভাবন মানে শুধু দামি যন্ত্র বা নতুন অ্যাপ নয়
স্বাস্থ্য খাতের পরিবর্তনে উদ্ভাবনকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে জুবাইদা রহমান বলেন, উদ্ভাবন বলতে শুধু ব্যয়বহুল যন্ত্র আবিষ্কার কিংবা নতুন নতুন অ্যাপ তৈরি বোঝায় না। মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে-এমন উদ্ভাবনই সবচেয়ে মূল্যবান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান এই পরিবর্তন বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম। দেশে সম্মানিত গবেষক, শক্তিশালী ওষুধশিল্প, অভিজ্ঞ চিকিৎসক, ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা, মাঠপর্যায়ের সংস্থা এবং উদ্যমী তরুণ সমাজ রয়েছে। তবে এসব সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
জুবাইদা রহমান বলেন, গবেষণাকে যাচাইয়ের সঙ্গে, যাচাইকে নিয়মনীতির সঙ্গে, নিয়মনীতিকে দায়িত্বশীল ক্রয়ের সঙ্গে এবং উদ্ভাবনকে সেবা প্রদানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি অংশকে রোগীর প্রয়োজন ও অধিকারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে।
রোগীর প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ার আহ্বান
গবেষক, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, ওষুধ প্রস্তুতকারক, উদ্ভাবক, পেশাজীবী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তার বক্তব্য, সঠিক শাসনব্যবস্থা স্বাস্থ্য খাতে দিকনির্দেশনা, মান, জবাবদিহিতা ও আস্থা তৈরি করে। এর মাধ্যমে সফল উদ্যোগগুলো গ্রহণ ও বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট হতে হবে এবং এর সুফল মানুষকে দৈনন্দিন জীবনে অনুভব করতে হবে।
জুবাইদা রহমানের মতে, পরবর্তী ধাপে উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা আগেভাগে রোগ শনাক্ত করবে, মানুষের ঘরের কাছে সেবা পৌঁছে দেবে, নিরাপদ চিকিৎসার ভিত্তি শক্তিশালী করবে এবং পরিবারকে স্বাস্থ্যব্যয়ের আর্থিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেবে।
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, উদ্ভাবনের মঞ্চকে শুধু কী সম্ভব তা নিয়ে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এখনই কোন কাজগুলো শুরু করা হবে, সে বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করতে হবে।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই