প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম আপডেট: ১৩.০৯.২০২৬ ১২:৪৯ পিএম (ভিজিট : ১০)

একদিকে নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, অন্যদিকে আয় না বাড়ার চাপ। এর মধ্যেই ভোক্তার খাদ্য ব্যয়ের তালিকায় যোগ হলো নতুন বোঝা। চিনি, ময়দা, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণ দেখিয়ে পাউরুটি, বিস্কুট, চানাচুরসহ শুকনা বেকারি পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নতুন দরে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে।
নতুন মূল্য কার্যকর করতে গত ৯ সেপ্টেম্বর বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় ‘ব্রেড বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি’। ঘোষণার পর দুই দিন কারখানা বন্ধ রেখে নতুন দর কার্যকরের প্রস্তুতি নেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এরপর শনিবার থেকে বাড়তি দরে উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু হয়।
নতুন দর অনুযায়ী, আগে ১০০ টাকায় বিক্রি হওয়া দুই পাউন্ডের একটি পাউরুটির দাম বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা। আর ৫০ টাকার এক পাউন্ড পাউরুটির দাম বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬০ টাকা। শুধু পাউরুটি নয়, অন্যান্য বেকারি পণ্যের দামও বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ চায়ের দোকানে আগে ১০ টাকায় বিক্রি হওয়া কিছু বেকারি পণ্যের দাম এখন ১৫ টাকা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, গত কয়েক মাসে বেকারি শিল্পে উৎপাদন ব্যয় এমনভাবে বেড়েছে যে আগের দামে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ময়দা, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো প্রধান কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে। এতে শুধু কাঁচামালের খরচই নয়, কারখানা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বাধ্য হয়েই পণ্যের দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
ব্রেড বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, রুটি, বিস্কুট, কেক, বাটার বনসহ সব ধরনের বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিছু পণ্যের ওজন কমিয়ে দাম সমন্বয় করা হয়েছে। আবার কিছু পণ্যের দাম সরাসরি বাড়ানো হয়েছে। সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় সমিতির সদস্যরা সম্মিলিতভাবে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে বেকারিগুলো স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। আগে ভোরের আলো ফোটার আগেই যেসব বেকারিতে পাউরুটি, কেক, বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজ শুরু হতো, এখন অনেক কারখানাকে দিনের বড় একটি সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে ছোট উদ্যোক্তারাই বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
তবে ব্যবসায়ীদের এই যুক্তির বিপরীতে ভোক্তাদের প্রশ্ন-প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা তুলনামূলক কম দামের এসব পণ্যের দাম একসঙ্গে এতটা বাড়বে কেন? সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, আয় বা বেতন বাড়েনি; অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর মধ্যে পাউরুটি, বিস্কুট ও অন্যান্য বেকারি পণ্যের দাম বাড়ায় পরিবারের দৈনন্দিন খরচ আরও বাড়বে।
হঠাৎ করে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতা ও চা-দোকানিরা বলছেন, নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর বেকারি পণ্যের বিক্রি কমে গেছে। আগে যেসব পণ্য দুপুরের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যেত, সেগুলোর একটি অংশ এখন দিনের শেষেও অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। অনেক ক্রেতা আগের তুলনায় কম পরিমাণে পণ্য কিনছেন। আবার কেউ কেউ বাড়তি দাম শুনে পণ্য না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন।
তবে সব বেকারি সমিতির নির্ধারিত নতুন দাম অনুসরণ করছে না। রাজধানীর মানিকনগরের ভাণ্ডারি বেকারির স্বত্বাধিকারী মো. আকাইদ হোসেন বলেন, তারা সমিতির বাড়ানো দাম অনুসরণ করেন না। আগে থেকেই নিজেদের উৎপাদন খরচ ও পণ্যের মান বিবেচনায় নিয়ে দাম নির্ধারণ করেছেন। বাজারের প্যাকেটজাত বিস্কুট, কেক ও রুটির তুলনায় তাদের পণ্যের মান উন্নত। তাই ভালো মানের পণ্যের জন্য তারা নিজেদের মতো করে কিছুটা বেশি দাম নেন। নতুন করে সমিতির ঘোষিত মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তারা দাম সমন্বয় করেননি।
মুগদা বাজারের একজন বেকারি ব্যবসায়ীও একই কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তারাও সমিতির বর্ধিত দাম অনুসরণ করছেন না। তাদের বেকারিতে বিভিন্ন আকার ও ধরনের কেক, বিস্কুট, পাউরুটি ও বাটার বন তৈরি করা হয়। এসব পণ্যের উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে গত জুন মাসেই দাম সমন্বয় করা হয়েছে। তাই সমিতির নতুন করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কারণে তারা আর দাম বাড়াবেন না।
ফলে একই ধরনের বেকারি পণ্যের ক্ষেত্রে একেক এলাকায় একেক দামের চিত্রও দেখা যাচ্ছে। কোথাও সমিতির নির্ধারিত নতুন দর কার্যকর হয়েছে, কোথাও আবার আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। এতে ভোক্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তিও তৈরি হচ্ছে।
দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ব্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা থাকলেও এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোক্তার পকেটে। বিশেষ করে ১০০ টাকার পাউরুটি ১২০ টাকা এবং ১০ টাকার বেকারি পণ্য ১৫ টাকা হওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর নিয়মিত খাদ্য ব্যয় বাড়বে। ফলে নিত্যপণ্যের বাজারে চলমান বাড়তি চাপের মধ্যে বেকারি পণ্যের নতুন মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তার জন্য আরও একটি বাড়তি খরচের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই