যেসব অপরাধে ধ্বংস হয়েছিল পূর্ববর্তী ৬ জাতি

অনলাইন ডেস্ক:

ধর্ম

ইতিহাস শুধু অতীতের গল্প নয়; ইতিহাস ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তাও। পবিত্র কোরআন পূর্ববর্তী বহু জাতির উত্থান-পতনের ঘটনা বর্ণনা করেছে,

2026-09-08T17:35:41+06:00
2026-09-08T17:35:41+06:00
মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

যেসব অপরাধে ধ্বংস হয়েছিল পূর্ববর্তী ৬ জাতি
অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৩৫ পিএম   (ভিজিট : ০)
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

ইতিহাস শুধু অতীতের গল্প নয়; ইতিহাস ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তাও। পবিত্র কোরআন পূর্ববর্তী বহু জাতির উত্থান-পতনের ঘটনা বর্ণনা করেছে, যাতে মানুষ তাদের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়।
কোনো জাতি শুধু শক্তিশালী হওয়ার কারণে ধ্বংস হয়নি; বরং যখন তারা আল্লাহর অবাধ্যতা, অহংকার, শিরক, নৈতিক অধঃপতন, অর্থনৈতিক অনিয়ম ও সত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে লিপ্ত হয়েছে, তখনই তাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে এসেছে।

সুরা আরাফের ৬৫ থেকে ৯৩ নম্বর আয়াতে নুহ (আ.), হুদ (আ.), সালেহ (আ.), লুত (আ.) ও শোয়াইব (আ.)-এর সম্প্রদায়ের পরিণতির কথা ধারাবাহিকভাবে এসেছে। এরপর ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের ঘটনাও কোরআনের বিভিন্ন স্থানে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এসব ঘটনা আজকের মানুষকে যেন বলে—অন্যায়ের পরিণতি বদলায় না; যুগ বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু আল্লাহর ন্যায়বিচারের বিধান বদলায় না।

১. নুহ (আ.)-এর জাতি—শিরক ও সত্য প্রত্যাখ্যানের পরিণতি : নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে দীর্ঘকাল আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো; তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো উপাস্য নেই।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৯)

কিন্তু তাঁর সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ সত্য গ্রহণ করেনি। তারা নিজেদের পূর্বপুরুষদের মূর্তিপূজার ওপর অটল ছিল।
অবশেষে তাদের অবাধ্যতা এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে আল্লাহ মহাপ্লাবনের মাধ্যমে তাদের ধ্বংস করলেন। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী বলল। ফলে আমি তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গে নৌকায় যারা ছিল তাদের রক্ষা করলাম এবং যারা আমার নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করেছিল তাদের ডুবিয়ে দিলাম।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৬৪)
শিক্ষা : তাওহিদ মানুষের মুক্তির মূল ভিত্তি। তাই পূর্বপুরুষের রীতি, সামাজিক প্রচলন বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা যাবে না।

২. আদ জাতি—অহংকার ও অবাধ্যতার পরিণতি : হুদ (আ.)-এর সম্প্রদায় ছিল আদ জাতি। তারা শারীরিক শক্তি, ক্ষমতা ও স্থাপত্যের দিক থেকে উন্নত ছিল। কিন্তু শক্তি তাদের বিনয়ী করার পরিবর্তে অহংকারী করে তুলেছিল। হুদ (আ.) তাদের বলেছিলেন, ‘তোমরা কি প্রত্যেক উঁচু স্থানে একটি নিদর্শন নির্মাণ করছ, অর্থহীনভাবে? আর তোমরা বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করছ, যেন তোমরা চিরকাল থাকবে।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ১২৮-১২৯)

তারা আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করল এবং হুদ (আ.)-এর বিরোধিতা করল। অবশেষে প্রবল ঝোড়ো বাতাস তাদের ধ্বংস করে দিল। আল্লাহ বলেন, ‘আর আদ জাতি—তাদের ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু দ্বারা।’ (সুরা : হাক্কাহ, আয়াত : ৬)
শিক্ষা : শক্তি, সম্পদ, প্রযুক্তি ও ক্ষমতা আল্লাহর নিয়ামত; এগুলো অহংকারের কারণ নয়। মানুষ যত শক্তিশালীই হোক, আল্লাহর সামনে সে দুর্বল।

৩. সামুদ জাতি—আল্লাহর নিদর্শনের অবমাননার পরিণতি : সালেহ (আ.)-এর সম্প্রদায় ছিল সামুদ। তারা আল্লাহর নিদর্শন দেখতে চেয়েছিল। আল্লাহ তাদের পরীক্ষার জন্য উটনীকে একটি নিদর্শন হিসেবে দিয়েছিলেন। সালেহ (আ.) সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘এটি আল্লাহর উটনী; তোমাদের জন্য এটি একটি নিদর্শন। সুতরাং তাকে আল্লাহর জমিনে চরে খেতে দাও এবং তার কোনো অনিষ্ট কোরো না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৭৩)
কিন্তু তারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে সেই উটনীকে হত্যা করল। এরপর তাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে এলো।
শিক্ষা : আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে উপহাস করা, সত্যকে অস্বীকার করা এবং জেনেশুনে আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘন করা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।

৪. লুত (আ.)-এর জাতি—নৈতিক অধঃপতনের পরিণতি : লুত (আ.)-এর সম্প্রদায় এমন এক নৈতিক বিপর্যয়ে নিমজ্জিত হয়েছিল, যা তাদের পূর্বে পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির মধ্যে দেখা যায়নি। তারা প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ও সমকামী যৌনাচারে লিপ্ত ছিল এবং নবীর সতর্কবার্তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। লুত (আ.) বলেছিলেন, ‘তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের আগে পৃথিবীর কেউ করেনি?’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৮০)

তারা সংশোধিত হওয়ার পরিবর্তে লুত (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। ফলে আল্লাহ তাদের ওপর কঠিন শাস্তি নাজিল করেন। কোরআনে এসেছে, ‘অতঃপর যখন আমার আদেশ এসে গেল, তখন আমি তার ওপরের অংশকে নিচের অংশ করে দিলাম এবং তাদের ওপর পোড়ামাটির পাথর বর্ষণ করলাম।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৮২)
শিক্ষা : কোনো সমাজ যখন প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ও নৈতিক বিপর্যয়কে স্বাভাবিক করে ফেলে এবং সংশোধনের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে, তখন তা ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনে।

৫. মাদায়েনবাসী—অর্থনৈতিক অসততা ও মানুষের অধিকার নষ্টের পরিণতি : শোয়াইব (আ.)-এর সম্প্রদায় মাদায়েনবাসীরা তাওহিদ থেকে বিচ্যুত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা করত। তারা মাপে ও ওজনে কম দিত এবং মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করত। শোয়াইব (আ.) বলেছিলেন, ‘তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ণ করো এবং মানুষের প্রাপ্য বস্তু কম দিয়ো না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৮৫)

তিনি তাদের আরো বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে সংস্কার সাধনের পর বিপর্যয় সৃষ্টি কোরো না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৮৫)
কিন্তু তারা তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করল। শেষ পর্যন্ত তাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে এলো।
শিক্ষা : নামাজ-রোজার পাশাপাশি মানুষের আর্থিক অধিকার রক্ষা করাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ব্যবসায় প্রতারণা, মাপে কম দেওয়া, ঘুষ, আত্মসাৎ ও মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা মারাত্মক অপরাধ।

৬. ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়—ক্ষমতার অহংকার ও সত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ : ফেরাউন ছিল ক্ষমতার চরম অহংকারে অন্ধ এক শাসক। সে নিজেকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের অধিকারী মনে করত এবং বনি ইসরাইলকে নির্যাতন করত। মুসা (আ.) তাকে আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু ফেরাউন অহংকারে সত্য প্রত্যাখ্যান করল। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই ফেরাউন পৃথিবীতে অহংকার করেছিল এবং তার অধিবাসীদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিল।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৪)
মুসা (আ.)-এর মু‘জিজা দেখে সত্য উপলব্ধি করার পরও ফেরাউন ও তার অনুসারীরা অস্বীকার করতে থাকে। অবশেষে আল্লাহ তাদের সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন।
শিক্ষা : রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, পদ, অর্থ কিংবা জনপ্রিয়তা—কোনোটিই মানুষকে আল্লাহর বিধানের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না।
আল্লাহ আমাদের কোরআনের আয়াত থেকে শিক্ষা গ্রহণ, সে অনুযায়ী আমল এবং পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ভুল থেকে নিজেদের রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ডেল্টা টাইমস/সিআর/এনজিটি








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ