ফাইলবন্দী দুর্নীতি: সমাজসেবা অধিদপ্তরে সাড়ে ৬ কোটি টাকার হিসাব গায়েব

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জাতীয়

সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালা লঙ্ঘন করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সদর কার্যালয়ে প্রায় ৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ

2026-08-31T14:56:18+06:00
2026-08-31T15:00:11+06:00
সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

ফাইলবন্দী দুর্নীতি: সমাজসেবা অধিদপ্তরে সাড়ে ৬ কোটি টাকার হিসাব গায়েব
নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ২:৫৬ পিএম   (ভিজিট : ৬)
ছবি: ডেল্টা টাইমস

ছবি: ডেল্টা টাইমস

সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালা লঙ্ঘন করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সদর কার্যালয়ে প্রায় ৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর-২০২৫) অনুযায়ী নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন খাতে কেনাকাটা করা হয়েছে বলে অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।

বিধিমালা অনুযায়ী রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন (আরএফকিউ) পদ্ধতিতে বছরে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত কেনাকাটার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অধিদপ্তরের নথিতে দেখা যায়, এই খাতে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার টাকা—অর্থাৎ অনুমোদিত সীমার চেয়ে ৩ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার টাকা বেশি খরচ দেখিয়ে কেনাকাটা সারা হয়েছে।

একইভাবে সরাসরি ভাউচারে বা নগদে কেনাকাটার ক্ষেত্রে বাৎসরিক সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ টাকা হলেও ব্যয়-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, এ খাতে মোট ২ কোটি ১৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা তোলা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সীমার তুলনায় ২ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা বাড়তি অর্থ ভাউচারের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, গত অর্থবছরে তৈরি করা প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল হিসাব রক্ষণ কার্যালয় (অ্যাকাউন্টস অফিস) থেকে যথাযথ প্রমাণাদির অভাবে ও বিধিবহির্ভূত হওয়ায় একবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা—সহকারী পরিচালক কামরুল হাসান সরকার ও সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) ফিরাদুল হক—যোগসাজশে সেই বিলগুলো চলতি অর্থবছরে পুনরায় উপস্থাপন করে পাস করিয়ে নেন এবং অর্থ উত্তোলন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সব মিলিয়ে আরএফকিউ খাতে বাড়তি ব্যয়, সরাসরি ভাউচারে অতিরিক্ত উত্তোলন এবং পুনরায় পাস করানো ভুয়া বিল—এই তিন খাত মিলিয়ে মোট প্রায় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৬ হাজার টাকার আর্থিক গরমিল ধরা পড়েছে অধিদপ্তরের হিসাবে।

নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড় অঙ্কের ক্রয়কাজ বিধি এড়াতে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে একই ধরনের প্রতিষ্ঠানকে বারবার কাজ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে নিউ বাকেরগঞ্জ ডেকোরেটর, ক্যাপিটাল ইলেকট্রিক, আরেজ কনস্ট্রাকশন, সলিউশন সিস্টেমস ও আফরিন এন্টারপ্রাইজ। কম্পিউটার সামগ্রী, সেমিনারের ব্যাগ, আপ্যায়ন, জ্বালানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী ও যানবাহন মেরামতের নামে এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ভাউচার তৈরি করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) ফিরাদুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এসএমএসের মাধ্যমে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো জবাব মেলেনি।

অন্যদিকে সহকারী পরিচালক কামরুল হাসান সরকারকে প্রশ্ন করা হলে তিনি গত অর্থবছরের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। তবে নথিপত্র বলছে, ওই সময় কেনাকাটার সঙ্গে তিনিও যুক্ত ছিলেন, এবং অডিট ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের নথিতেও তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুবের কাছে গত অর্থবছরের কেনাকাটায় অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রাথমিকভাবে বলেন, আরএফকিউতে যতটুকু কোটা ছিল, ঠিক ততটুকুই ব্যয় করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানী তথ্য-উপাত্তে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে বলে তাকে অবহিত করা হলে তিনি বিষয়টি নিজের জানা নেই বলে জানান এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জেনে জানানোর কথা বলেন।

পরবর্তীতে লিখিত জবাবে মহাপরিচালক জানান, স্থগিত থাকা বিলগুলোর হিসাবরক্ষণ অফিসে কোনো আপত্তি ছিল না, বরং বরাদ্দ সীমাবদ্ধতার কারণে বকেয়া দায় হিসেবে পরবর্তী বছরের বাজেট থেকে সরকারি নিয়ম ও জিএফআর (জেনারেল ফাইন্যান্সিয়াল রুলস) মেনে তা মেটানো হয়েছে।

আরএফকিউ সীমা অতিক্রমের বিষয়ে মহাপরিচালকের ব্যাখ্যা হলো, পিপিআর-২০০৫ অনুযায়ী পৃথক অর্থনৈতিক খাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে, এবং বর্তমানে দায়িত্ব নেওয়ার পর আরএফকিউর ব্যবহার কমিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র বা ওটিএম (ওপেন টেন্ডারিং মেথড) পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

নগদ বা সরাসরি ভাউচারে ক্রয়ের বিষয়ে তিনি জানান, এই সীমা ২৫ লাখ টাকা এবং প্রয়োজন হলে ডিরেক্ট কনট্রাক্টিং মেথড (ডিসিএম) প্রয়োগযোগ্য। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) অনুমোদনক্রমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ক্রয়কাজ চলমান থাকলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে সব ক্রয় ই-জিপি (ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার কথা জানান তিনি।

কাজ ভাগ করে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে মহাপরিচালক বলেন, অহেতুক প্যাকেজ ভাগ এড়াতে ৬টি কাজ ওটিএম পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে করা হয়েছে এবং চলতি অর্থবছরের আরএফকিউতে নতুন কোনো আদেশ না দেওয়ায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কোনো প্রকৃত কাজ না করেই এভাবে সরকারি অর্থ তছরুপ করা হচ্ছে বলে তারা মনে করেন। তাদের দাবি, সরকারি অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

ডেল্টা টাইমস/ আরএফ 









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ