
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেই রাখার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটি বলেছে, কোনো আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী বা তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। স্বাধীন তদন্ত সংস্থা, স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অথবা বিশেষ গুম তদন্ত কর্তৃপক্ষকে এ দায়িত্ব দিতে হবে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত সভায় এ দাবি জানায় এইচআরএসএস।
সংগঠনটি বলেছে, গুম বা বলপূর্বক অন্তর্ধান গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। একই সঙ্গে এটি আইনের শাসন, নাগরিকের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির ওপর সরাসরি আঘাত। কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় বা রাষ্ট্রের অনুমোদিত বা সমর্থিত কোনো পক্ষ আটক বা অপহরণের পর তার অবস্থান অস্বীকার কিংবা ভাগ্য ও অবস্থান গোপন করলে শুধু ওই ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকারই লঙ্ঘিত হয় না, তার পরিবারও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা, মানসিক যন্ত্রণা ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।
বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সংঘটিত গুমের অভিযোগ তদন্তে গঠিত গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে এইচআরএসএস বলেছে, এতে গুমের পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার কথা বলা হয়েছে। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগের পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড কাঠামোর অস্তিত্বের বিষয়ও তদন্তে উঠে এসেছে।
কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। গুমের পর ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার এবং ২৫১ জনের এখনো নিখোঁজ থাকার তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করেছে কমিশন।
এইচআরএসএসের সভায় বর্তমান পরিস্থিতির উদাহরণ হিসেবে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মনি এলাকার জেলে ও মোটরসাইকেল রাইডার মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
সংগঠনটির ভাষ্য, গত ১০ এপ্রিল মিরাজ শেখকে সিভিল ড্রেসে তুলে নিয়ে স্থানীয় কোস্টগার্ডের পল্টুনে নেওয়া হয়। পরে কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাকে স্পিডবোটে করে কোস্টগার্ডের বেইস ক্যাম্প দ্বিগরাজের দিকে নিয়ে যান। মিরাজের পরিবার তার সন্ধান চেয়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয়েছে। হাইকোর্টও তাকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের পর এটি প্রথম সম্ভাব্য গুমের ঘটনা।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনটি প্রশ্ন তুলেছে, মিরাজ শেখের ঘটনায় যদি কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে, তাহলে পুলিশ দিয়ে সেই অভিযোগের তদন্ত করানো প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করবে কি না।
২০২৫ সালের গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশের কথা উল্লেখ করে এইচআরএসএস বলেছে, ওই অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল। তবে অধ্যাদেশটি কার্যকর না থাকায় নতুন করে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভা ২০২৬ সালের আগস্টে খসড়াটি অনুমোদন করেছে।
এইচআরএসএস মনে করে, নতুন আইনে গুমকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে তদন্তের স্বাধীনতা ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুতর দুর্বলতা থাকলে আইনটি তার মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে না।
বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
সভা থেকে অতীতের গুমের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যতে গুম প্রতিরোধে কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এইচআরএসএস বলেছে, ২০০৯-২০২৪ সময়ে সংঘটিত গুমের অভিযোগগুলো দ্রুত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিচার করতে হবে। শুধু মাঠপর্যায়ের সদস্যদের নয়, নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারী এবং কমান্ড চেইনে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
গুমের ঘটনায় ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ স্পষ্ট করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, গুমের মতো গুরুতর অপরাধে শুধু সরাসরি অপরাধী নয়, যেসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানতেন বা জানার কথা ছিল অথচ অপরাধ প্রতিরোধ বা ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাদের দায়ও আইনে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ সংসদে চূড়ান্তভাবে পাস করার আগে নাগরিক সমাজ, ভুক্তভোগী পরিবার, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অর্থবহ পরামর্শের দাবি জানিয়েছে এইচআরএসএস।
সংগঠনটি বলেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত স্বাধীন ব্যবস্থার অধীনে আনতে হবে, অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ও ভয় সৃষ্টিকারী শাস্তির বিধান পুনর্বিবেচনা করতে হবে, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তদন্তে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও তা লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি কর্মকর্তা হলেও তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো বিশেষ দায়মুক্তি না রাখা এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত অবহিত করার বাধ্যবাধকতা রাখার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে। এইচআরএসএসের মতে, কমিশনকে সরকারের অধীন একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করে প্যারিস প্রিন্সিপালস-সম্মত স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
কমিশনের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা, নিজস্ব তদন্তকারী নিয়োগের ক্ষমতা, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা, নথি ও প্রমাণ তলব, সাক্ষী হাজির এবং আটক ও হেফাজত কেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষমতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এইচআরএসএস বলেছে, গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ, আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, শিক্ষা সহায়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবারের ‘রাইট টু ট্রুথ’ বা সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
যে কোনো ব্যক্তিকে আটকের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিচয়, আটকের সময়, স্থান, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আটকের আইনি কারণ ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত করা, পরিবার ও আইনজীবীকে দ্রুত অবহিত করা এবং সকল আটক ও হেফাজত কেন্দ্রে সিসিটিভি, ডিজিটাল কাস্টডি রেজিস্টার ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
এইচআরএসএস মনে করে, গুমের বিচার কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন। অতীতের গুমের বিচার না হলে ভবিষ্যতের গুম প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। শুধু অতীতের বিচার করলেই হবে না, এমন একটি শক্তিশালী আইন ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো নাগরিককে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে অদৃশ্য করে দেওয়া সম্ভব না হয়।