ফিফাকে ঘুষ দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার দুই ব্যবসায়ী, বিশাল অঙ্কের জরিমানা

স্পোর্টস ডেস্ক:

খেলাধুলা

ফিফার ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত দুর্নীতিকাণ্ডে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করেছেন আর্জেন্টিনার দুই ব্যবসায়ী হুগো জিনকিস ও তাঁর ছেলে

2026-08-28T17:07:27+06:00
2026-08-28T17:07:27+06:00
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩

ফিফাকে ঘুষ দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার দুই ব্যবসায়ী, বিশাল অঙ্কের জরিমানা
স্পোর্টস ডেস্ক:
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৫:০৭ পিএম   (ভিজিট : ০)

ফিফার ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত দুর্নীতিকাণ্ডে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করেছেন আর্জেন্টিনার দুই ব্যবসায়ী হুগো জিনকিস ও তাঁর ছেলে মারিয়ানো জিনকিস। বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও কোপা আমেরিকার মতো বড় টুর্নামেন্টের লাভজনক সম্প্রচার ও বিপণন স্বত্ব পেতে আন্তর্জাতিক ফুটবল কর্মকর্তাদের কোটি কোটি ডলার ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন তাঁরা।


বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিকিউটরদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর পর এই স্বীকারোক্তি দেন বাবা-ছেলে। সমঝোতার আওতায় তাঁদের বিরুদ্ধে আনা প্রতারণার অভিযোগে বিচার কার্যক্রম আর এগোবে না। তবে চুক্তির অংশ হিসেবে তাঁদের ৫ কোটি মার্কিন ডলার বাজেয়াপ্ত করা হবে।


হুগো ও মারিয়ানো জিনকিস আর্জেন্টিনার ক্রীড়া বিপণন প্রতিষ্ঠান ফুল প্লের সহ-মালিক। ২০১৫ সালে ফিফাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ব্যাপক দুর্নীতি তদন্তে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। ওই তদন্তে ফিফার পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল পরিচালনাকারী সংস্থা কনকাকাফ ও কনমেবলের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে।


কী ছিল অভিযোগ?

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, জিনকিসরা এমন একটি পরিকল্পনা করেছিলেন, যার মাধ্যমে ফিফা, কনকাকাফ ও কনমেবলকে প্রতারিত করা হয়। তাঁরা ফুটবল কর্মকর্তাদের ‘কয়েক কোটি ডলার বাণিজ্যিক ঘুষ’ দেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।


ঘুষ দেওয়ার বিনিময়ে বিভিন্ন ফুটবল প্রতিযোগিতার লাভজনক সম্প্রচার ও বিপণন স্বত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সমর্থন আদায় করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, মাঠের খেলার ফলাফল প্রভাবিত করা নয়; বরং টেলিভিশন সম্প্রচার, বিজ্ঞাপন ও বিপণন থেকে বিপুল অর্থ আয়ের অধিকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়াই ছিল এই ঘুষ লেনদেনের মূল লক্ষ্য।


আদালতের নথি অনুযায়ী, বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ ও কোপা আমেরিকাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মিডিয়া স্বত্ব পাওয়ার জন্য এই অর্থ দেওয়া হয়েছিল।


এক দশক ধরে চলা দুর্নীতি মামলা

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের নেতৃত্বে ফিফার দুর্নীতি নিয়ে যে তদন্ত শুরু হয়, তা বিশ্ব ফুটবলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তদন্তে ফিফা ও বিভিন্ন মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থার প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ, অর্থপাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।


তদন্তের অংশ হিসেবে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। একের পর এক কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় অনেকেই অপরাধ স্বীকার করেন অথবা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন।


জিনকিস বাবা-ছেলের বিরুদ্ধেও ওই তদন্তের পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়। মামলাটি বিচারের দিকে এগোলেও শেষ পর্যন্ত তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিকিউটরদের সঙ্গে ডিফার্ড প্রসিকিউশন অ্যাগ্রিমেন্ট (ডিপিএ) বা স্থগিত বিচার-সমঝোতায় পৌঁছান।


কী আছে সমঝোতায়?

সমঝোতা অনুযায়ী, জিনকিসদের বিরুদ্ধে আনা প্রতারণার অভিযোগে বিচার আর এগোবে না। এর বিনিময়ে তাঁরা অপরাধ স্বীকার করেছেন এবং ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেয়াপ্ত করতে সম্মত হয়েছেন।


আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, জিনকিসরা এমন একটি পরিকল্পনা করেছিলেন ও বাস্তবায়ন করেছিলেন, যার মাধ্যমে ফিফা, কনকাকাফ ও কনমেবল প্রতারিত হয়েছিল। এই সমঝোতার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নিষ্পত্তি হতে যাচ্ছে।


ফুল প্লের ভূমিকা

হুগো ও মারিয়ানো জিনকিস আর্জেন্টিনার ক্রীড়া বিপণন প্রতিষ্ঠান ফুল প্লের সহ-মালিক। লাতিন আমেরিকার ফুটবলের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচের সম্প্রচার ও বিপণন স্বত্ব নিয়ে তারা কাজ করত।


ফুটবলের জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে টেলিভিশন সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক স্বত্বের মূল্যও বেড়েছে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব কিংবা কোপা আমেরিকার মতো প্রতিযোগিতার ম্যাচের স্বত্ব থেকে বিপুল অর্থ আয় সম্ভব। এই বিশাল বাণিজ্যিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে জিনকিসরা ফুটবল কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছিলেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে উঠে আসে।


ঘুষের লক্ষ্য ছিল বাণিজ্যিক অধিকার

এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ঘুষের উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি কোনো ম্যাচের ফলাফল প্রভাবিত করা নয়। বরং লক্ষ্য ছিল মিডিয়া ও বিপণন স্বত্ব নিয়ন্ত্রণ করা।


বড় ফুটবল টুর্নামেন্টগুলোর সম্প্রচার অধিকার এখন শত শত কোটি ডলারের বৈশ্বিক ব্যবসার অংশ। সেই বাজারে কোনো একটি প্রতিযোগিতা বা ম্যাচের স্বত্ব পাওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা এনে দিতে পারে।


অভিযোগ অনুযায়ী, জিনকিসরা এই বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ফুটবল কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতায় অন্যদের তুলনায় অবৈধ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।


এক দশক পরও রয়ে গেল সেই কেলেঙ্কারির রেশ

২০১৫ সালের ফিফা দুর্নীতিকাণ্ডের এক দশক পর হুগো ও মারিয়ানো জিনকিসের স্বীকারোক্তি দেখিয়ে দিল, সেই কেলেঙ্কারির আইনি অধ্যায় এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।


একদিকে বাবা-ছেলে ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন, অন্যদিকে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। বিনিময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারণার অভিযোগে আর বিচার হবে না।


মাঠে বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার লড়াই যতটা রোমাঞ্চকর, মাঠের বাইরে এসব টুর্নামেন্টের মিডিয়া ও বিপণন স্বত্ব ঘিরে অর্থের লড়াইও যে কতটা বড় এবং অন্ধকার হতে পারে, জিনকিসদের স্বীকারোক্তি তারই আরেকটি উদাহরণ।










  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ