মো. শফিকুল ইসলাম:

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লি থেকে আসছে দুই ভিন্ন বার্তা। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য নয়াদিল্লি অপেক্ষা করছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের অবস্থান স্পষ্ট—তাড়াহুড়ো নয়; পারস্পরিক আস্থা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, কূটনৈতিক বোঝাপড়া ও সম্মানজনক আমন্ত্রণের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই হতে পারে এই সফর।
সামনে ব্রিকস সম্মেলন, পেছনে শেখ হাসিনা ইস্যুসহ একাধিক অমীমাংসিত বিষয়। দিল্লির আগ্রহ আর ঢাকার সতর্কতা মিলিয়ে সম্ভাব্য এই সফরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ—*দিল্লি চায় দ্রুত শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগ, ঢাকা চায় সেই যোগাযোগের আগে সম্পর্কের ভিত্তি পুনর্নির্মাণ।*
দিল্লির বার্তা: ‘আমরা অপেক্ষা করছি’
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রসঙ্গ।
২৯ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ত্রিবেদী জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে নয়াদিল্লি অপেক্ষা করছে—যদিও সফরের সময় নির্ধারণ বাংলাদেশের এখতিয়ার বলেই মন্তব্য করেন তিনি।
পরদিন একই সুরে তিনি বলেন, তারেক রহমান ভারত সফর করলে দুই দেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে গঠনমূলকভাবে এগোনোর সুযোগ তৈরি হবে; পারস্পরিক বোঝাপড়ায় অসমাধানযোগ্য কোনো সমস্যা নেই বলেও দাবি করেন।
৯ আগস্ট ঢাকার এক অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে—দুই প্রধানমন্ত্রী মুখোমুখি বসলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব, এই যুক্তিতে সরাসরি শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
পরদিন ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত শুধু সীমান্ত নয়, ‘স্বপ্নও ভাগ করে’; একই সঙ্গে জানান, তারেক রহমানের জন্য ভারতের আমন্ত্রণ বহাল রয়েছে।
এরপর নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। ১৮ আগস্ট ঢাকায় দেওয়া বক্তব্যে জানান, মোদি তাঁকে বলেছেন—‘আমাদের দেখা করা দরকার।’ ত্রিবেদীর ভাষ্যে, তারেক রহমান সফরে গেলে তাঁকে সম্মানজনক অভ্যর্থনা দেওয়া হবে এবং সফরটি স্মরণীয় করে তোলার প্রস্তুতিও থাকবে।
অর্থাৎ দিল্লির বার্তা এখন শুধু আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নেই—*শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি বৈঠককেই সম্পর্কের জট খুলতে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছে নয়াদিল্লি।*
ঢাকার বার্তা: আগে আস্থা, পরে সফর
দিল্লির এই আগ্রহের বিপরীতে ঢাকার অবস্থান তুলনামূলক সতর্ক। ১৭ আগস্ট মিন্টু রোডে সরকারি বাসভবনে বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন কবির বলেন, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করতে চায় না বাংলাদেশ। সফরের জন্য তিনি চারটি শর্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরেন—পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস, একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ।
তাঁর ভাষ্যে, ভারতীয় গণমাধ্যমে সফর নিয়ে যা প্রকাশিত হয়েছে তার বেশিরভাগই জল্পনানির্ভর; জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে শীর্ষ পর্যায়ের সফরের কোনো যুক্তি নেই। অর্থাৎ ঢাকা সফরের দরজা বন্ধ করছে না; সফরের আগে সম্পর্কের রাজনৈতিক-কূটনৈতিক ভিত্তি শক্ত করতে চাইছে।
দুই বক্তব্যের ফারাক কোথায়?
উভয় পক্ষই শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছে; মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। পার্থক্যটি *সময়, পরিবেশ ও অগ্রাধিকারের প্রশ্নে*—দিল্লির দৃষ্টিতে শীর্ষ বৈঠকই সমস্যা সমাধানের নতুন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, আর ঢাকার দৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় আস্থা ও সম্মানজনক পরিবেশ আগে তৈরি হওয়া উচিত।
এই পার্থক্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আগের সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতার উত্তরাধিকার এবং নতুন সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক কোন ভিত্তিতে দাঁড়াবে—সেই প্রশ্ন।
শেখ হাসিনা ইস্যুতে ঢাকার কঠোর বার্তা
দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান।
হুমায়ুন কবিরের অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য বা গণমাধ্যমে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলে তা দেশের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছে। তাঁর মতে, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা অস্থিতিশীল তৎপরতা চালানোর সুযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই ইস্যু তারেক রহমানের সফরের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, কারণ ঢাকা চাইছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হোক অতীতের রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়, *বর্তমান বাংলাদেশের জনগণের ম্যান্ডেট, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত।* সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকে ইস্যুটি সরাসরি আলোচনায় না এলেও দুই দেশের আস্থার পরিবেশে এর প্রভাব থাকতে পারে।
ব্রিকস কি হতে পারে নতুন মোড়?
সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনই এখন সম্ভাব্য সফর নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশকে সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত, ফলে তারেক রহমান সেখানে গেলে মোদির সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
প্রশ্ন হলো—এটি কি শুধু সম্মেলনে অংশগ্রহণ, নাকি সম্পর্কের বড় ‘রিসেট’ শুরুর সুযোগ? ভারতীয় পক্ষের ধারাবাহিক বক্তব্যে মনে হচ্ছে, নয়াদিল্লি শীর্ষ বৈঠককে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছে। ঢাকার হিসাব ভিন্ন—শুধু সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বৈঠক নয়, *বৈঠক হলে তার বাস্তব ফল কী হবে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।*
আলোচনার টেবিলে আসতে পারে যেসব ইস্যু
তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদি মুখোমুখি হলে আলোচনার তালিকা ছোট নয়—তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও প্রাণহানি, বাণিজ্য ঘাটতি, ভিসা সহজীকরণ, জ্বালানি সহযোগিতা, রেল-সড়ক যোগাযোগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক বাণিজ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বাংলাদেশের অবস্থান।
ভারতের অগ্রাধিকার থাকবে নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশের সহযোগিতা নিশ্চিত করা।
বৈঠক নিছক সৌজন্য সাক্ষাতে সীমাবদ্ধ থাকলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য সীমিত থাকবে; অমীমাংসিত ইস্যুতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেই তা সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’—সম্পর্কের নতুন ভিত্তি?
হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি দিক—‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি ভারতকেও নতুন বাস্তবতার ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে—এমন বার্তাই আসছে ঢাকার অবস্থান থেকে। অর্থাৎ ভারত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হলেও সম্পর্কের ভিত্তি হবে জাতীয় স্বার্থ।
আগের মতো কোনো একটি দেশের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার বদলে *ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ও বহুমুখী অংশীদারত্ব*কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ঢাকা। অন্যদিকে ভারতও বাংলাদেশকে শুধু প্রতিবেশী নয়, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে ধরে রাখতে আগ্রহী—ফলে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দিল্লির আগ্রহ, ঢাকার হিসাব
তারেক রহমানের ভারত সফর এখন আর কেবল ‘হবে কি হবে না’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; প্রশ্ন হলো, কোন পরিবেশে, কোন শর্তে এবং কী ফলাফল নিয়ে এই সফর হবে।
দিল্লি অপেক্ষা করছে, মোদির পক্ষ থেকেও সরাসরি সাক্ষাতের বার্তা এসেছে। ঢাকাও সম্ভাবনা নাকচ করছে না, তবে হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য বলছে—সফর হতে হবে মর্যাদাপূর্ণ, পারস্পরিক আস্থা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
মূল প্রশ্ন—ব্রিকস সম্মেলন কি সেই কাঙ্ক্ষিত ‘উপযুক্ত পরিবেশ’ তৈরি করতে পারবে? যদি পারে, সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে তারেক রহমান–নরেন্দ্র মোদি বৈঠক শুধু দুই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সাক্ষাৎ নয়, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনাও হতে পারে। আর আস্থার ঘাটতি, শেখ হাসিনা ইস্যু কিংবা দ্বিপক্ষীয় অমীমাংসিত বিষয় সামনে থাকলে দিল্লির অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতে পারে।
সুতরাং কূটনীতির আসল পরীক্ষা এখন সফরটি হবে কি না তা নয়; বরং সফর হলে ঢাকা কী নিয়ে যাবে এবং দিল্লি কী দিতে প্রস্তুত—সেটিই।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই