প্রকাশ: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৫৭ পিএম (ভিজিট : ৩)

ছবি : ইউনিসেফ
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পানি, স্যানিটেশন, হাত ধোয়ার সুবিধা, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা— এই পাঁচটি মৌলিক সেবার প্রায় প্রতিটিতেই বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে দুর্বল সারিতে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর যৌথ মনিটরিং প্রোগ্রাম (জেএমপি)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ‘প্রোগ্রেস অন ওয়াটার, স্যানিটেশন, হাইজিন, এনভায়রনমেন্টাল ক্লিনিং অ্যান্ড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইন হেলথ কেয়ার ফ্যাসিলিটিজ ২০১৫-২০২৫’ শিরোনামের এই প্রতিবেদন মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে বিশ্বের শতাধিক দেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সাম্প্রতিক জরিপ তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ‘মৌলিক সেবা’ বলতে বোঝানো হয়েছে এমন সুবিধা, যা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রাঙ্গণেই সরাসরি ব্যবহারযোগ্য। যেমন- প্রাঙ্গণে থাকা উন্নত পানির উৎস বা কার্যকর টয়লেট। এর তুলনায় ‘সীমিত সেবা’ বলতে বোঝানো হয়েছে আংশিক বা দুর্বল মানের সুবিধা। আর ‘কোনো সেবা নেই’ মানে ন্যূনতম মানও অনুপস্থিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৭১ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক পানি সেবা রয়েছে, ১৮ শতাংশে সীমিত এবং ১১ শতাংশে কোনো পানি সেবাই নেই। এই হার পাকিস্তানের (৭৫%) চেয়েও কম, যদিও ভারত (৯৭%), ভুটান (৯৭%), শ্রীলঙ্কা (৯৬%), ইরান (৮৮%), নেপাল (৮৩%) ও আফগানিস্তান (৮২%)— সবাই বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। অন্যদিকে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল হিসেবে পানি সেবায় বিশ্বের সর্বোচ্চ গড় কভারেজ (৮৯%) অর্জন করেছে, কিন্তু বাংলাদেশের হার এই আঞ্চলিক গড়ের চেয়েও কম।
স্যানিটেশন সূচকে চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের মাত্র ২৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক স্যানিটেশন সেবা আছে। ৫৭ শতাংশে সীমিত সেবা এবং ১৮ শতাংশে কোনো সেবাই নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু ভারত (৭৩%) উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। শ্রীলঙ্কা (৩৩%), ইরান ও ভুটান (উভয়ে ২২%) এবং নেপালও (২১%) বাংলাদেশের কাছাকাছি বা কিছুটা পিছিয়ে, তবে কোনো সেবা না থাকার হারে বাংলাদেশ (১৮%) নেপাল (৫%) ও ভারতের (৬%) চেয়ে অনেক পিছিয়ে।
প্রতিবেদনে ২০২২ সালের একটি স্বাস্থ্য সুবিধা জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মাত্র ১৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত, বাকিদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ সেপটিক ট্যাংক ও ১১ শতাংশ পিট ল্যাট্রিনের ওপর নির্ভরশীল।
হাত ধোয়ার সুবিধাসহ মৌলিক হাইজিন সেবা রয়েছে বাংলাদেশের মাত্র ৩২ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, ৪০ শতাংশে সীমিত এবং ২৭ শতাংশে কোনো সেবাই নেই। এই সূচকে ভারত (৯৪%), ইরান (৯৩%), শ্রীলঙ্কা (৯২%) ও ভুটান (৮৫%) অনেক এগিয়ে। নেপালেও এই হার ৭০ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৫৫ শতাংশ। উভয়েই বাংলাদেশের চেয়ে ভালো।
পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা সূচকে বাংলাদেশের চিত্র সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। মাত্র ২০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক সেবা রয়েছে, ৩১ শতাংশে সীমিত এবং প্রায় অর্ধেক—৪৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো সেবাই নেই। আফগানিস্তান (৮৩%), ভারত (৭৮%) ও শ্রীলঙ্কা (৫৭%) এই সূচকে অনেক এগিয়ে, যদিও নেপালের অবস্থা বাংলাদেশের চেয়েও নাজুক—মাত্র ৪ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক সেবা রয়েছে এবং ৮৪ শতাংশেই কোনো সেবা নেই।
স্বাস্থ্যসেবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। মাত্র ১৬ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবা আছে, ৫৫ শতাংশে সীমিত এবং ২৮ শতাংশে কোনো ব্যবস্থাপনাই নেই। এই হারের ভিত্তিতে বিশ্বের যে ১৬টি দেশের তালিকা প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান সুদান (৬৭%) ও পাকিস্তানের (৫৫%) পরই— অর্থাৎ বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত (৮৯%) ও আফগানিস্তান (৮২%) এই সূচকে অনেক এগিয়ে।
২০১৮ সালের একটি জরিপের বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কোনো নন-হাসপাতাল স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই সুচালো (শার্পস) বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ইনসিনারেটরের ব্যবহার পাওয়া যায়নি, যা সংক্রামক বর্জ্য নিরাপদে ধ্বংসের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কক্সবাজার অঞ্চলকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে জাতিসংঘের হেলথ রিসোর্সেস অ্যান্ড সার্ভিসেস অ্যাভেইলঅ্যাবিলিটি মনিটরিং সিস্টেম (হেরামস)-এর আওতায় নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের একটি চিত্রও প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে একজন সেবাকর্মীকে প্রসূতি কক্ষের বাইরে মেঝে পরিষ্কার করতে দেখা যায়। এটিকে দেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বাস্তব চিত্রের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সার্বিকভাবে পাঁচটি সূচকের মধ্যে চারটিতেই— স্যানিটেশন, হাইজিন, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলক তথ্যযুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে দুর্বল সারিতে, ভারত ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত পিছিয়ে। শুধু পানি সেবায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক ভালো, যদিও তা ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে কম। প্রতিবেদনে মালদ্বীপের জন্য এসব সূচকে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বৈশ্বিকভাবে প্রতি ১০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে একটিতে কোনো স্যানিটেশন সেবা নেই, যা প্রায় ৯৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। মাত্র ৪০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বৈশ্বিকভাবে মৌলিক স্যানিটেশন সেবার সব শর্ত পূরণ করে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে- স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন, হাইজিন ও পরিচ্ছন্নতা সুবিধা না থাকলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে এবং রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মী—উভয়ের জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষত প্রসূতি ও নবজাতক সেবায় নিয়োজিত কেন্দ্রগুলোতে এই ঘাটতি সরাসরি মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের সংক্রমণজনিত ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন।
২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এক দশকে বৈশ্বিকভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক পানি সেবার আওতা ৭৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবে প্রতিবেদনে ভারতের ‘কায়াকল্প’ উদ্যোগকে সফল মডেল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে নিয়মিত মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি ব্যবস্থার মাধ্যমে ২০১৫ সালের ১০০টি থেকে ২০২৫ সালে ৫১ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র মানদণ্ড অর্জন করেছে। এছাড়া ডব্লিউএইচও-ইউনিসেফের ‘ওয়াশ-ফিট’ টুল ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো নিজেদের ঘাটতি চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে উন্নয়ন-পরিকল্পনা করতে পারে। প্রতিবেদনে বর্জ্য উৎসেই তিন ভাগে পৃথকীকরণ, খোলা জায়গায় পোড়ানোর বদলে মাল্টি-চেম্বার ইনসিনারেটর ব্যবহার এবং অন্তত দুই দিনের পানি সংরক্ষণ সক্ষমতা নিশ্চিতের প্রযুক্তিগত মানদণ্ডও নির্দেশ করা হয়েছে। বাংলাদেশে পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে নিয়মিত ও হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহব্যবস্থা শক্তিশালী করাও জরুরি বলে মনে করছেন এই খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা।