মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নিতে গিয়ে নতুন আতঙ্কে রোহিঙ্গারা

ডেল্টা টাইমস ডেস্ক:

আন্তর্জাতিক

‘বাইরে বের হতে ভয় লাগে। বেশিরভাগ সময় ঘরেই থাকি। আমি খুব করে চাই মালয়েশিয়া ছেড়ে যেতে।’ রোহিঙ্গা শরণার্থী

2026-08-17T12:50:03+06:00
2026-08-17T12:50:03+06:00
সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নিতে গিয়ে নতুন আতঙ্কে রোহিঙ্গারা
ডেল্টা টাইমস ডেস্ক:
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৫০ পিএম   (ভিজিট : ০)

‘বাইরে বের হতে ভয় লাগে। বেশিরভাগ সময় ঘরেই থাকি। আমি খুব করে চাই মালয়েশিয়া ছেড়ে যেতে।’ রোহিঙ্গা শরণার্থী ও কমিউনিটি সংগঠক নূর সাদেকের কথায় এখন এমনই আতঙ্ক।

প্রায় পাঁচ বছর আগে মিয়ানমার থেকে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন তিনি। এখন অপরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে নিয়মিত হুমকির বার্তা পান। কেউ কেউ বার্তায় তার অবস্থানের জায়গার নামও লেখেন। এক ব্যক্তি তাকে পাঠিয়েছেন গুলি ছোড়ার একটি ভিডিও।

মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জীবন এমনিতেও সহজ ছিল না। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়তে থাকা ঘৃণা ও বিদ্বেষের প্রচারণা তাদের সেই জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

অধিকার সীমিত, নিরাপত্তাও অনিশ্চিত


মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। তাদের অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছান।

জাতিসংঘের হিসাবে, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গার সংখ্যা এক লাখের বেশি। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

মালয়েশিয়ায় তাদের জন্য আনুষ্ঠানিক কোনো শরণার্থী শিবির নেই। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তারা স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার পান।

দেশটিতে রোহিঙ্গারা আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করার সুযোগ পান না। তাদের সন্তানদেরও মালয়েশিয়ার সরকারি স্কুলে পড়ার সুযোগ নেই। ফলে জীবিকা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটাতে হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণার ঢেউ

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারণা আরও জোরালো হয়েছে। গত মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে অভিযোগ করা হয়, ঈদুল আজহার সময় জবাই করা পশুর বর্জ্য রোহিঙ্গারা অনুপযুক্তভাবে ফেলেছে। অভিযোগটি ঘিরে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়াতে থাকে।

জুনে আরেকটি মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়। সেখানে দাবি করা হয়, রোহিঙ্গা ও মালয় দম্পতিদের ঘরে ২০ লাখের বেশি শিশু জন্ম নিয়েছে। বিদেশিরা স্থানীয় নারীদের বিয়ে করে নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করছেন— এমন পুরোনো আশঙ্কাকেও উসকে দেওয়া হয়।

আরেকটি পোস্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ভুয়া ছবি ছড়ানো হয়। ছবিতে কথিত ‘রোহিঙ্গা মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট’কে দেখানো হয় এবং দাবি করা হয়, তিনি একটি পুরো শহর রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পোস্টটি শেয়ারকারীদের মধ্যে মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রীর মেয়েও ছিলেন।

একসময় রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি ছিল

এক দশক আগেও পরিস্থিতি এতটা প্রতিকূল ছিল না। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের সময় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। জাতিসংঘ ওই অভিযানকে ‘জাতিগত নিধনের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল।

তখন অনেক মালয়েশীয় রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে শরণার্থীরা সহজেই ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছেন।

অনলাইন ঘৃণার বাস্তব প্রভাব


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঘৃণার প্রচারণা শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। জুন ও জুলাইয়ে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা শিশুদের পড়ানো অন্তত নয়টি অনানুষ্ঠানিক স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষ অনুমোদন না থাকার কারণে বন্ধ করেছে। আবার কিছু স্কুলের শিক্ষক ও কর্মীরা নিরাপত্তার উদ্বেগে স্কুল বন্ধ করেছেন। একজন শিক্ষক জানিয়েছেন, তিনি শিশুদের দলবদ্ধ হয়ে চলাফেরা না করতে সতর্ক করেছেন। অর্থাৎ স্কুলে যাওয়াও কিছু শিশুর জন্য এখন নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নৌকা ফিরিয়ে দেওয়া ও আটক

মালয়েশিয়া সরকার এখন নিয়মিত রোহিঙ্গাদের বহনকারী নৌকা ফিরিয়ে দিচ্ছে অথবা তাদের আটক করছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে জাতিসংঘের কার্যালয়ে যাওয়ার পর শতাধিক রোহিঙ্গাকে পুলিশ আটক করে। জানা গেছে, একটি উচ্ছেদের ঘটনার পর তারা জাতিসংঘের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন।

এর মধ্যেই গত ২৯ জুলাই মালয়েশিয়া ঘোষণা করেছে, প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মিয়ানমারে ফিরে গেলে তাদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। মালয়েশিয়ান বারের সভাপতি আনন্দ রাজ বলেছেন, এ ধরনের প্রত্যাবাসন মানবিক নয় এবং বাস্তবসম্মত সমাধানও নয়।

তবু মালয়েশিয়ার পথে রোহিঙ্গারা

মালয়েশিয়ায় পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, রোহিঙ্গাদের অনেকে দেশটিতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। গত বছর প্রায় ৬ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা নৌপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩০০। ২০২০ সালে ছিল প্রায় ২ হাজার ৪০০।

সংখ্যা বাড়ার পেছনে রয়েছে মিয়ানমারে নিরাপত্তাহীনতা ও নিপীড়ন। মালয়েশিয়ায় থাকা এক রোহিঙ্গার কথায়, ‘আমরা পালিয়ে না এলে হয়তো আমাদের মেরে ফেলা হতো।’ মিয়ানমারে প্রাণের ভয়, আর আশ্রয়ের দেশ মালয়েশিয়ায় ক্রমবর্ধমান বৈরিতা ও অনিশ্চয়তা। এ দুইয়ের মাঝখানে পড়ে রোহিঙ্গাদের সামনে নিরাপদ জীবনের পথ দিন দিন আরও সংকুচিত হয়ে আসছে। - সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট


ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ